বিবাহিত নারী (কুড়ি)

  • 13 January, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 411 view(s)
  • লিখেছেন : চন্দন আঢ্য
শুধুমাত্র অতিথিদের মুখেই রান্নার কাজ তার সত্যতা খুঁজে পায়। যিনি রান্না করেন, অতিথিদের সমর্থন তাঁর প্রয়োজন। তিনি চান অতিথিরা তাঁর রান্না করা খাবারের প্রশংসা করুক, অতিথিরা যেন বারবার খাবার নেন। অতিথিদের যখন আর ক্ষুধা থাকে না তখন তিনি বিরক্ত হন : এতটাই বিরক্ত হন যে, কেউ জানে না আলু-ভাজা তাঁর স্বামীর জন্য ধার্য না কি তাঁর স্বামী আলু-ভাজার জন্য ধার্য।

একটি দরিদ্র পরিবারের মা তাঁর ব্যস্ত দিনগুলির মধ্যে প্রত্যেক দিন তাঁর শক্তি নিঃশেষিত করে ফেলেন। বিপরীতে বুর্জোয়া নারীরা, যাঁদের পরিচারিকা বা সাহায্য করার লোক আছে, তাঁরা প্রায় কর্মহীন দিন কাটান। আর এই অবসরের মুক্তিপণ হল একঘেয়েমি। কারণ তাঁরা একঘেয়েমি থেকে ক্লান্ত। নিজেদের কাজকে যাঁরা জটিল এবং বহু গুণে বাড়িয়ে তোলেন, তাঁরা প্রশিক্ষিত কাজের চেয়েও বেশি নিষ্পেষিত হন। নার্ভাস ব্রেকডাউনের মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন মেয়ে বন্ধু আমাকে বলেছিলেন, যখন তাঁর শরীর ভালো ছিল, কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই তিনি বাড়ির খেয়াল রাখতেন। অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং কাজের জন্য তাঁর হাতে তখন সময় থাকতো। যখন নিউরোস্থেনিয়া তাঁকে বাধা দেয় অন্য কাজে আত্মনিয়োগ করতে, তখন তিনি বাড়ির কাজে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে গ্রস্ত হতে অনুমতি দেন। বাড়ির কাজে দিনের সমস্ত সময় দিলেও সেই কাজ তিনি শেষ করতে পারতেন না।

দুঃখের বিষয় হল, এই কাজ কোনো স্থায়ী সৃষ্টিতে পর্যবসিত হয় না। আর,প্রলুব্ধ হয়ে মহিলারাও এই কাজে যতটা যত্ন প্রয়োগ করেন, তত পরিমাণে সেই কাজ সুসম্পন্ন হয়েছে বলে বিবেচনা করেন। উনুন থেকে যে-কেক তিনি বের করবেন, সেই কেকের কথা গভীরভাবে ভাবতে ভাবতে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন : এই কেক খাওয়া বাস্তবিকই লজ্জার! সত্যিই দুঃখের যে, স্বামী এবং সন্তানেরা তাঁদের কাদা-মাখা পা মোম-পালিশ করা মেঝের ওপর দিয়ে টেনে টেনে নিয়ে যান। এর ফলে ব্যবহার্য জিনিসগুলি যখনই নোংরা বা নষ্ট হয়ে যায়, তখনই দেখা যায়, যেমনটা আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, সেই নোংরা বা নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসগুলিকে তিনি সরিয়ে ফেলছেন। ফাঙ্গাসের আক্রমণ না-হওয়া পর্যন্ত তিনি তখন জ্যাম সংরক্ষিত করে রাখেন, বসার ঘরে তালা লাগিয়ে দেন। কিন্তু আমরা কেউই সময়কে থামিয়ে রাখতে পারি না। মজুত জিনিসপত্র আকর্ষণ করে ইদুরকে। শুরু হয় পোকার উপদ্রব। কম্বল,পর্দা, জামাকাপড় পতঙ্গ কেটে দেয় : পৃথিবী পাথরে-খোদিত কোনো স্বপ্ন নয়। পচনের ভয় আছে এমন এক সন্দেহজনক পদার্থের দ্বারা এই পৃথিবী গঠিত। ভোজ্য উপাদানগুলি দালির মাংস-দৈত্যের মতোই প্রশ্নবিদ্ধ। এগুলিকে জড় এবং অজৈব দেখালেও ভিতরে লুকিয়ে থাকা লার্ভা এগুলিকে মৃতদেহে রূপান্তরিত করে দেয়। যে-গৃহিণী নিজেকে সমস্ত জিনিসপত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন, তিনি জিনিসগুলির মতোই গোটা পৃথিবীর ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন : লিনেনগুলি ধূসর হয়ে যায়, রোস্ট করা খাবার পুড়ে যায়, পোর্সেলিনের জিনিসপত্র ভেঙে যায়। এগুলি হল চরম বিপর্যয়। কারণ জিনিসগুলি যখন হারিয়ে যায়, তখন তারা হারিয়ে যায় অপূরণীয়ভাবে। এগুলির মাধ্যমে স্থায়িত্ব এবং নিরাপত্তা লাভ করা অসম্ভব। 

গৃহশ্রমের পণ্যকে তাই অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। স্ত্রীদের কাছ থেকে ফলত অনবরত দাবি করা হয় আত্মত্যাগ--যাতে অনুশোচনা ছাড়াই এই কাজে তিনি সম্মতি দেন, যাতে ছোটোখাটো হলোকস্টের মতো এই আত্মত্যাগ তাঁর মধ্যে অবশ্যই কোনো-না-কোনোভাবে আনন্দ এবং সুখানুভব উদ্রেক করে।  কিন্তু গৃহস্থালির স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য বাড়ির কাজ করতে করতে গৃহিণী ক্লান্ত হয়ে পড়ায় বাড়ি ফেরার পর স্বামী লক্ষ করেন অগোছালো অবস্থা এবং অব্যবস্থা। যদিও নিশ্চিতভাবেই তিনি শৃঙ্খলা এবং পরিচ্ছন্নতাকেই কেবল মঞ্জুর করেন। উত্তম-প্রস্তুত আহারের প্রতি তিনি বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন। রাঁধুনির কাছে সেটাই জয়ের মুহূর্ত যখন তিনি একটি সুস্বাদু খাবার টেবিলের ওপর রাখেন আর স্বামী-সন্তানেরা সেই খাবারকে সাদরে অভিবাদন জানান কেবল শব্দের দ্বারা নয়, আনন্দের সঙ্গে সেই খাবারটি খাওয়ার মাধ্যমেও। রন্ধনসম্পর্কীয় রসায়ন চলতেই থাকে আর খাবার পরিণত হতে থাকে অন্নরস আর রক্তে। কাঠের মেঝের যত্ন নেওয়ার চেয়ে শরীরের যত্ন নেওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আরও বেশি সুদৃঢ় আগ্রহের। যাই হোক, নিজেকে জিনিসপত্র থেকে সরিয়ে নেওয়া বা বিচ্ছিন্ন করার চেয়ে বাইরের স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করা কম নিরর্থক হলেও কম বিপজ্জনক নয়। শুধুমাত্র অতিথিদের মুখেই রান্নার কাজ তার সত্যতা খুঁজে পায়। যিনি রান্না করেন, অতিথিদের সমর্থন তাঁর প্রয়োজন। তিনি চান অতিথিরা তাঁর রান্না করা খাবারের প্রশংসা করুক, অতিথিরা যেন বারবার খাবার নেন। অতিথিদের যখন আর ক্ষুধা থাকে না তখন তিনি বিরক্ত হন : এতটাই বিরক্ত হন যে, কেউ জানে না আলু-ভাজা তাঁর স্বামীর জন্য ধার্য না কি তাঁর স্বামী আলু-ভাজার জন্যধার্য। গৃহিণীর সম্পূর্ণ মনোভাবের মধ্যে এই দ্ব্যর্থকতার সন্ধান মেলে। স্বামীর জন্য তিনি তাঁর বাড়ি প্রস্তুত রাখেন। আবার এটাও চান যে স্বামী তাঁর উপার্জিত সমস্ত অর্থই ব্যয় করুন ফ্রিজ বা আসবাবপত্র কিনে। স্বামীকে তিনি সুখী রাখতে চান : আবার তিনি স্বামীর সেই সব ক্রিয়াকলাপকেই অনুমোদন করেন যেগুলো স্ত্রীর নির্মিত সুখের কাঠামোর মধ্যে খাপ খায়।

এমনও অনেক যুগ ছিল যখন এই দাবিদাওয়াগুলি মোটের ওপর তৃপ্ত হয়েছিল। সেই সময় সুখও ছিল পুরুষের আদর্শ। প্রাথমিকভাবে পুরুষ তখন ছিল নিজের ঘর এবং পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত। শিশুরা নিজেরাই নিজেদের সংজ্ঞায়িত করার পথ বেছে নিয়েছিল পরিবার, ঐতিহ্য এবং অতীতের সাহায্যে। ফলত, যে-নারী বাড়িতে রাজত্ব করতেন, খাবার টেবিলের প্রধান ছিলেন, তাঁকে প্রবল প্রতাপশালী হিসাবে স্বীকার করা হত। বিক্ষিপ্তভাবে যাঁরা পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতাকে চিরস্থায়ী করেছেন এমন জমির-মালিক বা ধনী কৃষকের স্ত্রী হিসাবে বাড়িতে সেই নারী এখনও তাঁর গৌরবময় ভূমিকা পালন করেন। যদিও সামগ্রিকভাবে, আজকের দিনে বিয়ে হল অপ্রচলিত রীতিনীতির এখনও টিঁকে থাকা। সেই সঙ্গে স্ত্রীর অবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রশংসাহীন, কারণ এখনও তাঁর দায়িত্বের স্বরূপ একই, যদিও তা আর আগের মতো তাঁকে অধিকার দেয় না। তাঁর কাজের ফিরিস্তি একই থাকলেও সেই কাজের জন্য তাঁর কোনো স্বীকৃতি বা সম্মান নেই। পুরুষ আজকের দিনে বিয়ে করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিবাহের মধ্যে নোঙর করার জন্য, নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বন্দি করার জন্য নন। পুরুষ চান বাড়ি, তবে সেখান থেকে পালানোর জন্য মুক্তও থাকতে চান। থিতু হলেও মনের দিক থেকে তিনি প্রায়শই ভবঘুরে থেকে যান। সুখকে তিনি অবজ্ঞা করেন না, যদিও তা তিনি নিজের মধ্যে শেষ করেন না। পুনরাবৃত্তি পুরুষকে বিরক্ত করে। তিনি সন্ধান করেন নতুনত্বের, ঝুঁকির, জয় করার মতো প্রতিবন্ধকতা, পারস্পরিক আস্থা এবং বন্ধুত্বের যা তাঁকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যবর্তী নিঃসঙ্গতা থেকে বের করে আনবে। শিশুরা স্বামীর চেয়েও বেশি বাড়ির সীমা ছাড়িয়ে যেতে চায়। স্ত্রী চেষ্টা করে চলেন স্থায়িত্ব এবং ধারাবাহিকতার একটি মহাবিশ্ব গঠন করতে। স্বামী এবং শিশুরা চান সেই পরিস্থিতিকে পেরিয়ে যেতে যা বিবাহিত নারী সৃষ্টি করেছেন এবং যা তাঁদের কাছে দেওয়া হয়। এই কারণে, যদি তিনি তাঁর সমস্ত জীবন উৎসর্গ করা কার্যকলাপের অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করতে ঘৃণা করেন, তাহলে জোর করে তাঁর ওপর এই পরিষেবাগুলি চাপিয়ে দেওয়া হয়। মা এবং গৃহিণী থেকে তখন তিনি হয়ে ওঠেন সৎ-মা এবং খাণ্ডারনী।

লেখক : অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক

ছবি : সংগৃহীত

 

0 Comments

Post Comment