গ্যাংগ্রিন

  • 14 June, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 591 view(s)
  • লিখেছেন : ​​​​​​​চন্দন আনোয়ার
বাবা -মার জেদাজেদিতে, বিশেষ করে বাবার চরম অবস্থান এবং সত্য প্রকাশের জন্য মায়ের উপরে নিরন্তর চাপ প্রয়োগের কারণে আমার জন্মের গণ্ডগোলের খবরটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একদিন দুজনের কথা কাটকাটি চলছে তুমুল; বাবা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে দড়াম দড়াম শব্দে লাথি চালায় দরজায়। ডাকাতের হাতে পড়া পথিকের আর্তনাদের মতো আর্তনাদ করে ওঠে মা। এই প্রথম পরাজয় মেনে নেয় এবং হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বিছানার উপরে লুটিয়ে পড়ে গলা ছেড়ে চিৎকার করে মা। চিৎকারের এক ফাঁকে মা বলে, খেল্ খতম! সাপও তুমি, ওঝাও তুমি, কাটো-ঝাড়ো সবই করো!

বাবা-মার জেদাজেদিতে, বিশেষ করে বাবার চরম অবস্থান এবং সত্য প্রকাশের জন্য মায়ের উপরে নিরন্তর চাপ প্রয়োগের কারণে আমার জন্মের গণ্ডগোলের খবরটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একদিন দুজনের কথা কাটকাটি চলছে তুমুল; বাবা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে দড়াম দড়াম শব্দে লাথি চালায় দরজায়। ডাকাতের হাতে পড়া পথিকের আর্তনাদের মতো আর্তনাদ করে ওঠে মা। এই প্রথম পরাজয় মেনে নেয় এবং হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বিছানা উপরে লুটিয়ে পড়ে গলা ছেড়ে চিৎকার করে মা।

চিৎকারের এক ফাঁকে মা বলে, খেল্ খতম! সাপও তুমি, ওঝাও তুমি, কাটো-ঝাড়ো সবই করো!

নাটক করিস না মাগি। নাটক বাদ দিয়ে সত্য কথাটা বল। ছেলেটার নাক, মুখ, চুল, বডি কোনোটাই তো দেখতে আমার মতো না, তারপরেও আমার বলে চালিয়ে দিচ্ছিস, এই কী তোর বিচার! বাবার কণ্ঠ ক্রোধে কাঁপছে।

এরপরের ঘটনা উপন্যাসের কাহিনির মতো।

বাবার নতুন সংসার হয়। মা  চলে আসে নানার বাড়ি। সঙ্গে আমি।

হাইস্কুলে ভর্তির দিন। বাবার নামের জায়গাটি খালি রেখেই জমা দেই ভর্তির ফরম। প্রধান শিক্ষক ঐ জায়গা লাল কালিতে মার্ক করে মাকে বললেন, এখানে ছেলের বাবার নাম লিখুন।

মা চরম বিব্রত এবং অপ্রস্তুত। না লিখলে চলবে না?

প্রধান শিক্ষক কাজে ব্যস্ত ছিলেন, মার কথার প্রত্যুত্তরে শুধু বললেন, না, লিখতেই হবে।

মা আর কিছু বলেনি। হঠাৎ একটানে লিখে ফেলে, বাবুল হোসেন।

এই লোকটির নাম আমি প্রথম শুনলাম।

বাড়ি ফেরার পথে মা হাঁটছে আগে, আমি হাঁটছি পিছে। দু-জন স্রেফ পথচারি, অচেনা। বাড়ির উঠোনে পৌঁছেই মা দৌড়াল, এমনভাবে দৌড়াল, যেন আমি এক আততায়ী, তার পিঠে ছোরা বসানোর জন্যে উদ্ধত। যাই হোক, সেদিন আর দুজনে মুখোমুখি হইনি। সেই রাতে খাবার, বিছানা সবই চলে নানির তত্ত্বাবধানে। আর সেদিন থেকেই, আমি যেন যুবতী মায়ের বিবাহ উপযুক্ত যুবক ছেলে, দুজনের ভীষণ সঙ্কোচ। বাবুল হোসেন লোকটি কে? এই প্রশ্নটি লাশেরমতো নিরাপদে শুয়ে আছে মা-ছেলের সম্পর্কের মধ্যখানে।

মাস দুই পরে, স্কুলে যাচ্ছি, পেছন থেকে কে যেন ডাকে, ঐ ছোকড়া, দাঁড়া।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, বাবা! এই লোকটা এখানে! মিচকে শয়তানের মতো মিচকে হেসে আমার দিকে এগিয়ে আসছে দেখে আমি যমভয় নিয়ে দৌড়ানোর মতো হাঁটছি। লোকটি একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল। আমি স্কুল-মাঠে পৌঁছে দৌড়ে টিকলের কাছে গিয়ে আজলা আজলা পানি নাকে-মুখে ছিটিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লাসে এসে বসতেই দেখি, লোকটি স্কুল-মাঠে ঢুকছে। সোজা প্রধান শিক্ষকের অফিসে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পরে সেখান থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে দেখে আমার সন্দেহ হয়।

বই-খাতা এক বন্ধুর জিম্মায় রেখে জীবনে এই প্রথম স্কুল-পালাই। কী দিয়ে যে এলো, আমি তো এলাম দৌড়ে, তবু লোকটি আমার আগেই নানির বাড়িতে উপস্থিত।

দুই জন অবলা নারী, পুরুষ আমি একা। বৃত্তাকার উঠোনের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে লোকটি এমন ভয়ানক ও বিশ্রীভাবে চিৎকার করে, যেন কেউ মুগুর দিয়ে তার হাড়-পাঁজর গুড়িয়ে দিচ্ছে, গমগমে লোহারপাত দিয়ে কলিজা এফোঁড়-ওফোঁড় করছে। 

গেলো তো! থলের কালো বিড়াল বের হয়ে গেল তো! এবার কি বলবি? বেশ্যামাগী, এবার বল্ কী বলবি? এবার তোর মুখে কথা নাই। আমার সন্দেহটাই ঠিক। বাবুল হোসেন মালটা কে? এতো বড়ো প্রতারণা! আমার ঘর করলি, আর শুইলি...। ছি! ছি!! মুখ থেকে একদলা থুথু ওয়াক করে ছুঁড়ে ফেলল উঠোনে। পরকীয়ার খাউজানি থাকলে আমারে বললি না ক্যানো? ভালোই ভালোই মিটাতে পারতি। নেমকহারামি করলি! 

মা-নানি ঘরের ভেতরে। আমি দাঁড়িয়ে আছি নিরাপদ দূরত্বে। লোকটি এবার আমার দিকে তাকাল হাঙরের মতো হা মুখ করে। ভয়ে আমার পাকিস্থলীতে গরর করে শব্দ হল। এবার আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, পেট-বাঁধালি কার সাথে, আর মালটা আমার বলে চালিয়ে দিচ্ছিলি। পাঁঠীমাগী, রঙবাজি করার আর মানুষ পাওনি। এবার দেখবি খেলা। একধারসে আরো কিছুক্ষণ চালিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

ভেবেছিলাম, এতো বছরের সংসার, মার উপরে বাবা বড়ো ধরনের কোনো অবিচার করবে না। বড়োজোর ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবে।

বাবার খেলা যে এতো ভয়ঙ্কর হবে, মা, আমি আমরা কেউ ভাবিনি।

পরের দিন-ই বাড়িতে পুলিশ উপস্থিত। আমরা হতবাক। প্রতারণা ও ক্ষতিপূরণের মামলার আসামি মা। দশভরি স্বর্ণ ও নগদ পাঁচলাখ টাকা নিয়ে বাবুল হোসেন নামের এক যুবকের সাথে চম্পট দিয়েছে।

মা একটি বাক্যও খরচ করেনি। চলুন, বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আসামির এই আচরণে পুলিশও অপ্রস্তুত।

মা’র জামিন নিতে সময় লাগল ১৫দিন। এ কয়দিনে এই খবরটি ছড়িয়ে গেল লেলিহান আগুনের মতো। ঢিঢিক্কার পড়ে গেল।

আমার স্কুলের ভর্তি বাতিল হয়ে গেল।  

ইতিহাসের এক পর্ব এখানেই শেষ।

মা’র সাহস অতিরিক্ত। যুবতী বয়স, তবু ঢাকায় এসে সম্পূর্ণ অচেনা অজানা একটি বস্তিতে ঘরভাড়া নেবার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্ব। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, মায়ের চালচলন, লোকজনের সাথে মেলামেশা দেখে। যেন কতোকাল ধরে এই শহরে! জন্ম, বেড়ে ওঠা ইত্যাদি এই ঢাকা শহরেই হয়েছে। স্বামী মারা গিয়েছে, এই কথাটি মা অত্যন্ত শান্ত, স্বাভাবিক ও পাকাপোক্তভাবে বলে। জলজ্যান্ত জীবিত মানুষকে যেভাবে মৃত বলে চালিয়ে দেয়, তা অবিশ্বাস্য। হাতে কিছু টাকা ছিল, সেই টাকায় চলে মাস তিন। বস্তির অন্যরা যে কাজ করে, মা’র দ্বারা সেসব কাজ করা সম্ভব ছিল না। ভদ্রঘরের মেয়ে, অষ্টম শ্রেণি পাস করে নবম শ্রেণির প্রথম সাময়িক পর্যন্ত পড়া মেয়েমানুষের জন্যে সত্যিই কঠিন ছিল কোনো কাজ জুটানো। কঠিন প্রত্যয়ী মা নেতিয়ে পড়া লতার মতো ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ছে দেখে, আমি যারপরণাই ছোটাছুটি করতে লাগলাম। যেটাই ঠিক করি, মার তাতে সায় নেই। ছেলেকে ডাক্তার, না হয় ইঞ্জিনিয়ার বানাবার স্বপ্ন দেখে যে মা, সে কী করে ছেলের কর্ম হিসেবে হোটেল বয় বা দোকানের কর্মচারীর কাজ মেনে নেয়। হঠাৎ এক দর্জির সাথে পরিচয় হয়। মা টুকটাক সেলাই জানতো, গ্রামের মেয়েরা যতটুকু জানে আর কি।

এখান থেকেই শুরু ইতিহাসের আর এক পর্ব।

এক মাসেই মা পাকা দর্জি। আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। আমাকে নিয়ে তার স্বপ্নটা অর্ধ-মৃত অবস্থায় বেঁচে ছিল। বছরের চার মাস চলে গিয়েছে বলে কোনো স্কুলেই ভর্তি নিচ্ছিল না, শেষে আরো আটমাস অপেক্ষা করে জানুয়ারিতে স্কুলে ভর্তি হই। কিন্তু সবকিছু এলোমেলো আর অগোছালো। লেখাপড়ার প্রতি আমার মন নেই। অনেক বন্ধু-বান্ধব জুটেছে। যদিও কিছুই ছুঁইনি, সারাদিন টোটো করে ঘুরে বেড়াই বলে কেমন মালখোর মালখোর টাইপের চেহারা হয়েছে। মা আমাকে শিখিয়ে দেয়নি, আমি নিজেই বলি, বাবা মরে গেছে। কিভাবে মারা গেছে, জানতে চাইলে সোজা বলে দেই, রোড্ এক্সিডেন্টে। এতে আমি ভালোই আছি। কিন্তু আমার নিজের যে জগৎটি, যেখানে আমি সম্পূর্ণ একা, সেখানে ঠিকই শেকড় গেড়ে আছে একটি জিজ্ঞাসাচিহ্ন। এই জিজ্ঞাসা চিহ্ন যেন ধারালো চকচকে এক একটা চাকু, তিলার্ধ নড়চড় হলেই কচুকাটার মতো কচকচ করে কাটে কলিজা।

বাবুল হোসেন বলে আসলেই কারও অস্তিত্ব আছে মার জীবনে? যদি থাকে, তবে বাবার এই হিংস্র আচরণের যৌক্তিকতা আছে। কিন্তু মা’র আচরণে কারও অস্তিত্ব থাকার লেশমাত্র চিহ্ন নেই। ধর্মের তৈরি রাষ্ট্রে ধর্মকেই ব্যবহার করে বাঙালি দমনের কৌশলের মতো মা কি তাহলে পাকিস্তানি কৌশল গ্রহণ করল? বাবার পাশবিকতার জুতসই জবাব দিতেই হয়তো বাবুল হোসেন নামের অস্তিত্বহীন চরিত্রের উদ্ভব ঘটিয়েছে।

মায়ের হাতযশ অবিশ্বাস্য। পাঁচ বছরেই একটি দোকান ও একটি টেইলার্সের মালিক। পাঁচজন লোক খাটে। এই উন্নতিতে বস্তি ছেড়ে একটি পুরানা ফ্লাটবাড়ির নিচতলায় উঠি। জীবনের একটা ছন্দ তৈরি করে নিয়েছে মা। দিনরাত তার ব্যস্ততা। টাকা উপার্জনের অন্ধ নেশায় ধরেছে। আমার সন্দেহ হয়, মা বুঝি নিজের উপরে প্রতিশোধ নিচ্ছে। এই টাকার নেশা কার জন্যে? নাকি নিজের অতীতকে ভুলে থাকার একটি ইন্দ্রজাল তৈরি করছে। রাতের খাবারটা একসাথে হয়। সেখানে তার খিটমিটে মেজাজ। সারাদিন কী করি, লেখাপড়া চলছে কেমন ইত্যাদি রুটিন কথাবার্তা। আমি অতিষ্ঠ। মানুষ বেঁচে থাকলে বদলাবে, তাই বলে এভাবে! বাবা তার জীবনে ছিল একযুগের বেশি সময়। জন্মভিটা। সেই গ্রাম। এতো ঠুনকো জিনিস! প্রকাশ্যে বা আড়ালে তার অতীতকে স্মরণ করে একবারও জোরে শ্বাস ফেলার নজির নেই। তার চোখমুখ তন্ময় বর্তমানে, ভবিষ্যতে। মা নিজেকে যে হারে পাল্টে নিয়েছে বা নিচ্ছে, আমি তার তুলনায় অনেক পেছনে। বিপরীতে বরং আমি ক্রমশ অতীতচারী হচ্ছি। মা বোধহয় বোঝে ব্যাপারটা। তাই, তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ ফেলে কথা বলা কঠিন অস্বস্তির আমার জন্যে।  স্রেফ পালিয়ে বেড়াচ্ছি আর কি!

বাবার সাথে একটি বোঝাপড়া..., অতর্কিত আক্রমণের মতো মা’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হঠাৎ এই কথাটি বলে ফেলি একদিন।

তালাচাবি দেয়া বন্ধ কপাটে জোরে লাথি মারলে যেমন নড়ে ওঠে, কিন্তু খোলে না, মার অবস্থা তাই। আমার কথার কেনো প্রত্যুত্তর দিল না। আমি বলি, তুমি অথবা আমি যতোই অস্বীকার করি না কেনো, লোকটা তো বেঁচে আছে।

মা এবার নড়েচড়ে বসে, কিছু বলবে এমন একটি অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে চেহারায়। তবু নীরবই রইল। আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে যাচ্ছি, তখনি মা মুখ খোলে, এই নিয়ে আর কখনও কথা বলো না। বড়ো হয়েছো, কলেজে পড়ো, যদি পারো সামাধান বের করো, দু-দিন আগে পরে তোমাকেই একটা সমাধান বের করতে হবে।

মা’র একটা নিজস্ব ভাষা আছে। এই ভাষা অর্জুনের ধনুর্বাণের মতো লক্ষ্যভেদী। এই ভাষায় কথা বললে আর পেরে ওঠা যায় না। আগেও দেখেছি, বাবার অনেক কথার জবাব একটি দু-টি বাক্যে দিয়েছে। বাবা যখন পেরে উঠত না তখনি জংলি আচরণ করত। আমার সমস্ত জিজ্ঞাসা, এতোদিনের পরিকল্পনা, দ্বিধা-ভয়-সঙ্কোচ অর্থাৎ সমগ্র প্যাকেজটিরই এককথায় একটি উপসংহার টেনে দিল। জীবিত মানুষকে মৃত বলে চালিয়ে দিচ্ছি, এখন তার কী সমাধান?

হেমন্তের সন্ধ্যা। বিদ্যুৎ নেই। সন্ধ্যার প্রেতায়িত অন্ধকার নেমে আসছে। আমি বের হবো বের হবো করছি। ঠিক তখনি মোবাইল বেজে ওঠে। অপরিচিত নম্বর। রিসিভ বাটুন টিপে কানে তুলতেই শুনতে পেলাম, আমি তোমার পিতা বলছি।

শুধু আমি একা নই, সমস্ত বিল্ডিংটি কেঁপে উঠল। নির্বাক আমি। কী বলব ভাষা পাচ্ছি না।

কথা বলছ না কেন? আমি তোমার পিতা মফিজুর রহমান বলছি।

মফিজুর রহমান! কে মফিজুর রহমান? আমার বাবা মারা গেছেন।

তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! জলজ্যান্ত বাপ বেঁচে আছে...! আল্লাহর আরশ  কাঁপছে!

মোবাইল আর ধরে রাখা সম্ভব হল না। কট করে লাইনটি কেটে দিলাম। এতো বছর পরে, লোকটি হঠাৎ করে বোল পাল্টে ছেলে দাবি করছে! নিশ্চয় এখন মার কাছে স্বামীর অধিকারও দাবি করবে। মিরাকেল! মোবাইল নম্বর যখন কোনোভাবে ম্যানেজ করে নিয়েছে, শেয়ানা লোক, নিশ্চয় বাসার ঠিকানাও জোগাড় করতে বাকি নেই। কোনো একদিন সশরীরে হাজির হলে মা অথবা আমার এই মহল্লায় বাস করা কঠিন। বন্ধুদের বাড়াবাড়িতে দু-বার বাবার মৃত্যুবার্ষিকীও পালন করেছি। এখন যখন ওরা জানবে, বাবা বেঁচে আছে, কী অঘটনটাই না ঘটবে! কিন্তু মার দিকটা আরও জটিল। সধবা নারী বিধবা সেজে ব্যবসা গড়ে তুলেছে, জানাজানি হলে সর্বনাশ। রুমের দরজা-জানালা বন্ধ ছিল। একটি জানালা খুলে দিতেই বাতাসকে দাবড়িয়ে আগেই ঢুকে পড়ে সন্ধ্যার অন্ধকার। এই অন্ধকার তাড়াতে লাইট দিতে গিয়ে দেখি বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলটা তখনও বেজে যাচ্ছে এক ধারসে। সুইচ অফ করে দেই।

সন্ধ্যার গুমোট অন্ধকার মগজে ঢুকে সব এলোমেলো করে দিচ্ছে। এখন অন্ধকারই নিরাপদ। আর বের হওয়া হয়নি। মা ফিরেছে রাত ১০টার দিকে। প্রতিদিনের রুটিন কাজ করে মা শুয়ে পড়ে। আমি জেগে থাকি গভীর রাত পর্যন্ত।

এতো ত্বড়িৎগতিতে লোকটি সব ঘটিয়ে ফেলবে আমি ভাবিনি। সাধারণত, কাজের মেয়েমানুষটি আসে সকাল সাতটার মধ্যে। সকাল ৬টার দিকেই বেল বেজে ওঠে। মা ঘুমিয়েই ছিল। দরজা খুলেই অবাক। মুখভর্তি নিপাট দাড়ি, মাথায় টুপি, সাদারঙের পাঞ্জাবির নিচে কালোরঙের নরমাল প্যান্ট পরিহিত পঞ্চাশোর্ধ বয়সী ধারালো চেহারার সুবেশধারী একলোক দাঁড়িয়ে আছে। টুপির নিচে ফেসো পাটের মতো সাদাকালো চুল, মস্তবড়ো কালো দুটি চোখের উপরে মোটা ফ্রেমের চশমা। 

কোনোপ্রকার অনুমতির তোয়াক্কা করেনি লোকটি। আমাকে প্রায় ধাক্কা মেরে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। আমি পথ আটকে দাঁড়াই। আপনি কে? এভাবে  বাসায়  ঢুকে পড়ছেন!

বাইরে দাঁড়িয়ে বলব? এক প্রকার ধমকের স্বর লোকটির।

আশ্চর্য, আমি আপনাকে চিনি না, আর এভাবে অশোভনভাবে রুমে ঢুকে পড়ছেন?

তোমার মাকে ডাকো,  সে চিনে কি না দেখি। ভালো সুখেই আছো দেখছি।

ওহ! আপনি?  লোকটির কণ্ঠস্বর পাল্টায়নি মোটেই।

এখন মা কী করবে? আমিই বা কী করতে পারি? লোকটিকে দরজা থেকেই তাড়িয়ে দেবো কি না তা ভাবতে গিয়ে মাথা চক্কর মারে। এই মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখা প্রয়োজন। এখনি তাড়িয়ে দিতে পারি, কিন্তু এ কোনো সমাধান নয়। এছাড়া লোকটি এতো সহজ মানুষ না যে, ঘটনাটি সহজে মিটবে। এতো বছরেও যখন মেটেনি, এখন তো আরো জটিল। ভেতরে ভেতরে নিশ্চয় যাবতীয় খোঁজখবর নিয়ে এসেছে।  বড়ো ধরনের প্রস্তুতি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

ততোক্ষণে মার ঘুম ভেঙে গেছে। কে এসেছে, বিছানায় শুয়েই জিজ্ঞেস করে। আমার প্রত্যুত্তর না পেয়ে নিজেই উঠে আসে। আমি যা কল্পনা করিনি, মা তাই বলে, তাকে  ভেতরে আসতে দাও।

লোকটি সাবলীলভাবে রুমের ভেতরে প্রবেশ করে, যেন তারি বাসা, এবং এই কিছুক্ষণ আগে বাসা থেকে বেরিয়ে এখনি ফিরলেন। তাকে গেস্টরুমে বসতে দিয়ে মাকে নিয়ে তার রুমে গেলাম। তুমি লোকটিকে ভেতরে ঢুকতে দিলে কেন? আমি মাকে বললাম।

তুমি তাকে চেনো না, ও খালি হাতে আসেনি। মা বলে।

খালি হাতে আসেনি মানে কি? আমি চমকে উঠলাম।

খালি হাতে মানে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়া আসেনি। আমাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে এসেছে।

সে তো আমাকে ছেলে বলে স্বীকার করে না। এখন কেন পিতার দাবি নিয়ে...? টাকা-পয়সার লোভে!

কেন বুঝতে পারোনি?

এখন কী করবো? এখনি তাড়িয়ে দেই।

তাড়িয়ে দিলেই চলে যাবে?  গেলেই কী ছেড়ে দেবে? ও এই রকম মানুষ না।

কী করবে?

কী করবে, তুমি আমি ভাবতেও পারব না।

এই পর্যন্ত কথা মার সঙ্গে। তারপর সোজা লোকটির সামনে এসে বলি, আপনি এখনি চলে যান, আর কোনোদিন আসবেন না। যদি আসেন, তবে...।

আমি ভেবেছিলাম, বড়ো ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া জানাবে। আমার কথা শোনার পরে মোটামুটি শান্তভাবেই বসে থাকল। দ্বিতীয়বার যখন বলেছি, আপনি এখান থেকে চলে যান, তখন বলল, তোমার মাকে ডাকো। এটা কি তোমার মার কথা, নাকি তোমার কথা? আমি বললাম, আমাদের দুজনেরই। সে বলল, তোমার মাকে ডাকো, সে নিজের মুখে বলুক। আমি ক্ষিপ্ত হয়ে গেলাম, মাকে ডাকতে হবে কেন? আমি বলছি, আপনার হচ্ছে না। আপনি আর কথা না বাড়িয়ে এখনি চলে যান। আর কোনোদিন এদিকে আসলে...। কথা বলতে বলতে আমি তার মুখোমুখি হলে সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল।  আমি ভাবতেও পারি নি, আশ্চর্য এক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে, ঠাস করে এক চড় মারল আমার গালে। বেয়াদব ছেলে, মা-টা যেমন বেয়াদব মহিলা, ছেলেটাও হয়েছে তাই। পিতার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় শেখায়নি।

এখন আমার কী করা উচিৎ? আর করতেই পারি বা কী? মানুষটির রক্ত আমার শরীরে। রক্তের সঙ্গে রক্তের লড়াই ভয়ানক হয়। প্রকৃতপক্ষে তার সঙ্গে লড়াই করার কোনো ইচ্ছেই নেই। বরং যে কোনো একটি  সমাধানে পৌঁছানোই মঙ্গল। কিন্তু মা এতোটা নীরব কেন? বিশেষত, শিকার যখন তার খাঁচায় বন্দি। মা আর তার সামনে আসেনি। এই অপমান সহ্য করে তার পক্ষে এখানে এক মুহূর্ত থাকা কঠিন। যখন চলে যাচ্ছে, তখন লোকটির জন্যে বরং কিছুটা মায়াই হল।

এরপর কিছুদিন একটা ভয় শিকারখেকো বাঘের মতো পেছন থেকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এই বুঝি লোকটি এলো। জীবনে আর কখনও এতোটা অসহায় হইনি। মা ভেঙে পড়ছে। মুখোমুখি হলেই দুর্বোধ্য ভাষায় কি যেন বলে। আমি তার কিছুই ধরতে পারি না। তার এতো শ্রম ও যত্নের সাজানো বাগান  যেন একমুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল লোকটি। কোনোমতেই মা আগের জীবনে ফিরে যেতে চায় না। লোকটির কাছে তো নয়ই। মুক্তির একটিই উপায়, মা ডিভোর্স দিতে পারে। কিন্তু এতোদিন পরে তা কি সম্ভব? লোকটি সেটা মানবে না, মামলা-মোকদ্দমায় ওস্তাদ। একে তো ধূরন্ধর, তার উপরে ধর্মের লেবাস। অপ্রতিরোধ্য টেনশন ও উদ্বেগের মধ্যে দিয়ে কাটে দুই সপ্তাহ। আমি ধরেই নিয়েছি, লোকটি আমাদের উপরে দয়া দেখিয়েছে। তবু ভয়, মানুষের বেসিক চরিত্র সাধারণত বদলায় না। লোকটি কঠিন জেদি, যা বলে তা করেই ছাড়ে, জানের ভয় করে না। কুকুরের লেজের মতো আর কি।

বিষয়টি নিয়ে মার সাথে আরও খোলামেলা আলাপ করা উচিত। এভাবে আতঙ্ক নিয়ে বাঁচা যায় না। একটি নির্দিষ্ট সমাধানে আসতেই হবে। সেদিনের ঘটনার পরে এই প্রথম মা’র মুখোমুখি হই।

লোকটিকে তুমি ডিভোর্স দাও, এইভাবে বাঁচা যায় না?

মা ঘাড়গুঁজে হিসাব কষছিল। আমার কথার প্রত্যুত্তরে বলল, তুমি?

আমি, আমি মানে?

তোমাকে কী করব?

আমাকে কী করবে মানে?

কী হবে ডিভোর্স দিলে?

কঠিন এক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি। বিষয়টিকে এভাবে ভাবিনি।

সে কী করবে? সে কী করার ক্ষমতা রাখে? প্রচণ্ড ক্রোধ ও হিংস্রতা জ্বলে ওঠে রক্তের ভেতরে।

প্রয়োজনে খুন করবে। মা বলে।

অ্যা! খুন? কাকে?

আমাকে।

কেনো?

ছেলের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে।

আমার চোখেমুখে বিদ্রপের হাসি, কী ভয়ানক তামাশা! আমার পিতৃত্বকে অস্বীকার করে কী নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে তোমার উপরে! এখন সেই ছেলের উপরে দাবি প্রতিষ্ঠার জন্যে তোমাকে খুন পর্যন্ত করতে পারে!

আমার কথার প্রত্যুত্তরে মা নীরব। তার নীরবতাকে আঘাত করার জন্যেই প্রায় চেঁচিয়ে বললাম, আমি লোকটিকে পিতা বলে মানি না? এই রকম বর্বর অমানুষ আমার পিতা...

তার রক্ত তোমার শরীরে। মা বলে।

এবার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। বিকট শব্দে চিৎকার করি। আমি এই রক্তকে অস্বীকার করি। সাপে কামড় দিলে বিষাক্ত রক্ত যেমন শরীর থেকে বের করা হয়, আমি আমার শরীরের সমস্ত বিষাক্ত রক্ত বের করে ফেলব।

হঠাৎ রান্নাঘরে থালা-বাসান পড়ার হুটহাট শব্দ হল। মা লাফিয়ে উঠল, প্রতিদিন মাছ খেয়ে সাবাড় করে দিচ্ছে বিড়ালটা, পোষা বিড়াল বলে খাতির নাই, দাঁড়া।

অতীতে মাকে কখনও এতোটা নৃশংস হতে দেখি নি। প্রথমে বেড়ালটির মাথার উপরে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল বটি দিয়ে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল বেচারা। চার-হাত পা ছেড়ে দিয়েছে।

বিড়ালটির চোখের দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মা।

দীর্ঘদিনের পোষা বিড়াল। ভীষণ মায়া হচ্ছিল। মা’র চোখের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছি। 

আমি ভাবতেই পারিনি, মা এতোটা নৃশংস হতে পারে! বিড়ালটির দুই ঠ্যাং দুই হাতে ধরে একটানে ফেঁড়ে দুই খণ্ড করে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল বাইরে। 

 

পুনঃপ্রকাশ

লেখক: কথাসাহিত্যিক, অধ্যাপক (নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ)

ছবি:  সংগৃহীত 

0 Comments

Post Comment