হিজাব কাণ্ড গেরুয়া বাহিনীর অন্যতম চক্রান্ত

  • 15 February, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 308 view(s)
  • লিখেছেন : তামান্না
বিগত কিছুদিন থেকে কোন এক অজ্ঞাত কারণে মুসলিম নারীরা অঘটন ঘটন পটিয়সী হয়ে উঠেছেন! সুল্লি ডিলস, বুল্লি বাই, হিজাব বিতর্ক একটার পর এক ঘটনা ঘটেই চলছে। মুসলিম নারীরা ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছেন! কে বা কারা পরিকল্পনা মাফিক এই সকল কাজ করছেন? সন্দেহ জাগে মনে। এদিকে আবার আমাদের মহামান্য রাজাধিরাজ উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে একটি জনসভায় বক্তৃতায় বলেছেন-"‘মুসলিম বোন-কন্যারা আমাদের সদিচ্ছা বোঝেন"।

কিছুদিন থেকে 'হিজাব' কে কেন্দ্র করে আসমুদ্রহিমাচল উত্তাল হয়ে আছে। গত বছর থেকে কর্ণাটকে 'হিজাব' বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত বছর ২৮ ডিসেম্বর উদুপির গভর্নমেন্ট স্পন্সরড কলেজে হিজাব পরা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এরপর উদুপি জেলার পরপর চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানান, হিজাব পরে কলেজে আসলে, কলেজে প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে না। এছাড়া কলেজ কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেন- কলেজে হিজাব পরে এসে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে। এরপর,কর্ণাটকে উদুপির একটি সরকারি প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজ-শ্রেণিকক্ষে হিজাব পরে আসলে ছাত্রীদের কলেজের বাইরে চলে যেতে বলা হয়। তারপরে  হিজাব সংক্রান্ত বিবাদ সারা রাজ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টির  সংগঠনগুলি হিজাব পরে ছাত্রীদের ক্লাসে আসার তীব্র বিরোধিতা করে। একদল তরুণ গেরুয়া উত্তরীয় পরে ক্লাসে ঢোকার চেষ্টা করেন। এরপর বিভিন্ন জায়গা থেকে কখনও পুলিশের সঙ্গে পড়ুয়াদের সংঘর্ষ শুরু হয়, দেখা যায় অভিভাবকদের পাথর ছোড়ার ঘটনার মতো অনঅভিপ্রেত ঘটনাও।

এরপর আবার কর্নাটকের মান্ডা জেলার একটি প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজের বি.কম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মুসকান খানের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ফলে 'হিজাব বিতর্ক' সরগরম হয়ে ওঠে। ভিডিওটিতে দেখা গেছে যে মুসকান হিজাব পরে তাঁর স্কুটি পার্ক করে ক্লাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, সেইসময় গেরুয়া রঙের স্কার্ফ পরিহিত একদল ব্যক্তি 'জয় শ্রী রাম' স্লোগান দিতে দিতে মুসকানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তখন মুসকান দু'হাত তুলে 'আল্লাহু আকবার' বলে চিৎকার করতে থাকেন। ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক স্লোগানের সামনে, মুসকান প্রচন্ড ভয় পেয়ে, ধর্মীয় স্লোগান দিয়েছেন। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুসকান জানিয়েছেন- "আপনি কী বললেন..? আমি বললাম আল্লাহু আকবার। কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। ভয় পেলে আমি আল্লাহর নাম নিই। আল্লাহর নাম নিলেই আমার সাহস বেড়ে যায়।" (তথ্যসূত্র: BBC NEWS বাংলা, ১০/০২/২০২২)

মুসকানকে হেনস্তা করার জন্য দেশেবিদেশে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। এই প্রসঙ্গে মালালা টুইটে বলেন- "হিজাবের কারণে মেয়েদের স্কুলে যেতে না দেয়াটা ভয়াবহ ব্যাপার। মেয়েরা কম বা বেশি যতটুকুই কাপড় পরুক - তাদের পণ্য হিসেবে দেখাটা চলছেই। ভারতের নেতাদের অবশ্যই মুসলিম মেয়েদের মার্জিনালাইজ করা বন্ধ করতে হবে।"

ভারতের বিরোধীদল কংগ্রেসের প্রিয়াংকা গান্ধী টুইট করে জানান- "বিকিনি হোক, ঘোমটা হোক, জিন্স হোক আর হিজাবই হোক, মেয়েরা কি পরবে তা ঠিক করার অধিকার তাদেরই। এই অধিকার ভারতের সংবিধানে সংরক্ষিত। নারীদের হয়রানি করা বন্ধ করুন।'' (তথ্যসূত্র: BBC NEWS বাংলা, ০৯/০২/২০২২)

বিগত কিছুদিন থেকে কোন এক অজ্ঞাত কারণে মুসলিম নারীরা অঘটন ঘটন পটিয়সী হয়ে উঠেছেন! সুল্লি ডিলস, বুল্লি বাই, হিজাব বিতর্ক একটার পর এক ঘটনা ঘটেই চলছে। মুসলিম নারীরা ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছেন! কে বা কাহারা পরিকল্পনা মাফিক এই সকল কাজ করিতেছেন? সন্দেহ জাগে মনে। এদিকে আবার আমাদের মহামান্য রাজাধিরাজ উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে একটি জনসভায় বক্তৃতায় বলেছেন-"‘মুসলিম বোন-কন্যারা আমাদের সদিচ্ছা বোঝেন। আমরা তাদের তিন তালাক থেকে মুক্ত করেছি, সুরক্ষা দিয়েছে। বিজেপি যখন মুসলিম মহিলাদের সমর্থন পেয়েছে, তখন এই ভোট-ঠিকাদাররা অস্থির হয়ে উঠেছে। কারণ তাদের মেয়েরা 'মোদী-মোদী' রব তুলেছেন। তারা মুসলিম বোনদের সাথে প্রতারণা করছে। আমাদের সরকার 'হর মজলুম' (প্রতিটি নির্যাতিতা) মুসলিম নারীর পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা মুসলিম বোনদের সাথে প্রতারণা করছে যাতে মুসলিম কন্যাদের জীবন সর্বদা পিছিয়ে থাকে।" (তথ্যসূত্র :Hindustan Times বাংলা, ১০/০২/২০২২)

 কে বা কাহারা মুসলিম কন্যাদের পিছিয়ে রাখতে চাইছেন? সত্যিই এই প্রশ্নের একটি উত্তর চাই। একের পর এক পরিকল্পিতভাবে যে ঘটনাগুলি ঘটছে, তাতে মনে সংশয় দেখা দিচ্ছে! বিশেষ কোন একটি ইস্যুকে ইচ্ছাকৃত ভাবে তুলে ধরে, সেই ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দড়ি টানাটানি খেলা বহু পুরনো একটি প্রথা। সম্প্রতি এই খেলাটা একটু বেশি মাত্রায় শুরু হয়েছে। কর্ণাটকের হিজাব কাণ্ডের রেশ ছড়িয়ে পড়িয়েছে রাজ্যে রাজ্যে। দিল্লি, মহারাষ্ট্র , কলকাতাতে ছাত্ররা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন।

এই সমস্ত ছাত্ররা নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার হিজাব পরা বলে অনেক কোলাহল করছেন। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে সেই কথা শোনার কেউ নেই। সমস্ত বিদ্যায়তনিক প্রতিষ্ঠানে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো হিজাব পরা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে! ব্যক্তিগত ভাবে আমার হিজাব নিয়ে কোন সমস্যা নেই। কে কী খাবেন, কী পরবেন একান্ত তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার! যাঁর যা খুশি তাই করবেন! তবে যাঁরা হিজাব পরা তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে কলতান করছেন, তাঁদেরকে এটুকু বলা যেতে পারে, না এটা তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়, কারণ আপনি নিজে হিজাব পছন্দ করেননি; আপনার মগজ ধোলাই করে ধীর বিষক্রিয়া করে আপনার মগজে এই ভাল মেয়ে খারাপ মেয়ে প্রোগ্রাম সেট করে দিয়েছেন পিতারা। তবে, কাউকে জোর করে, তাঁর অমতে হিজাব খোলার মতো জঘন্য পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা কখনো সমর্থনযোগ্য হতে পারে না!  

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রোকেয়া পর্দার আড়ালে থাকতেন। সওগাত পত্রিকার মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন যখনই রোকেয়ার কাছ থেকে যখন লেখা আনতে যেতেন তখন তিনি লক্ষ্য করেছেন, রোকেয়া পর্দার আড়ালে থেকে কথা বলছেন। এমনটা দেখে একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, ‘আপনি এতো প্রগতির কথা বলেন, নারী স্বাধীনতার কথা বলেন, সেই আপনি যদি পর্দার আড়ালে থাকেন তাহলে কিভাবে কি হবে!’ তখন রোকেয়া বলেছিলেন, ‘আজকে আমি আপনার সামনে এসে কথা বললে কোনোভাবে যদি বাইরের মানুষের কাছে এই খবর চলে যায় তাহলে কেউই তাদের মেয়েদের আমার স্কুলে পাঠাবেন না!"  এই মন্তব্য থেকে রোকেয়ার দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। নারীমুক্তির জন্য কাজ করতে গিয়ে রোকেয়া অনেক ধৈর্য এবং বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন। (তথ্যসূত্র: সারাবাংলা, sarabangla.net, ২৬/০২/২০২১)

একইভাবে, আজকের দিনে অনেক মুসলিম নারীকে পারিবারিক, সামাজিক চাপে পর্দা, হিজাব মেনে নিতে হয়। কালকে যখন এই হিজাব নিষিদ্ধ হয়ে যাবে তখন কিন্তু এই নারীদের বাড়ির বাইরে বেরোতে দেওয়া হবে না, তার মানে বোঝা যাচ্ছে তাঁদের পড়াশোনার ইতি এখানে হয়ে যাবে। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি কর্ণাটকের উপনির্বাচনে শাসক বিজেপির ফল আশানুরূপ হয়নি। বিভিন্ন কারণে সরকারের জনপ্রিয়তাও নিম্নগামী। আগামী বছরের মে মাসে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন। কংগ্রেসের অভিযোগ, বিজেপি অন্যান্য রাজ্যের মতো কর্ণাটকে ধর্মীয় মেরুকরণ সৃষ্টিতে মরিয়া। হিজাব বিতর্ক সেই উদ্দেশ্যেই। (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ৫/২/২০২২) 

যাইহোক, সমস্ত কিছু দেখে শুনে খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারা যাচ্ছে একরাশ বিপদের মাঝখানে মুসলিম নারীরা রয়েছেন!  কূটকৌশলীরা তাঁদের ক্ষুরধার মস্তিষ্কের ব্যবহার করে একের পর এক তুরুপের তাস বের করছেন। 

যে কোন ভাবে তাঁরা বারবার জটিলতার সৃষ্টি করেন। একবার তাঁদের কর্মকাণ্ড দেখে নেওয়া যাক। 

ক) তালাক

মুসলিমদের বিয়ে হবে ছেলে–‌মেয়ের মত নিয়ে, চুক্তিভিত্তিক। বিয়ের বেলায়  সম–‌অধিকার কিন্তু বিবাহ–‌বিচ্ছেদে যেন প্রভুর হুঙ্কার, পিতৃতন্ত্রের দাপট। দাপট–‌মুক্তির আইন, লিঙ্গ সাম্যের আইনের আবেদন ছিল সরকারের কাছে। কিন্তু কী পেলাম? রাষ্ট্রশক্তি মুসলিম মেয়েদের নিয়ন্ত্রণে রেখে, মুসলিম পুরুষদের ক্রিমিন্যাল তকমা আঁটার প্যাঁচ কষা আইন ঘোষণা করল।  বিভাজন আর পিতৃতান্ত্রিকতার আধিপত্যে রচিত হল তাৎক্ষণিক তিন তালাক বিল। ভারতের উচ্চ আদালত যে তালাককে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে, সরকারের ক্যারিশমার জোরে, আইনের ফেরে সেই তালাক মুসলিম পরিবার ভাঙনের কাজে লাগবে। (তথ্যসূত্র:আজকাল ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)

খ) লিবারাল ডজ

২০২১ সালের মে মাসে 'লিবারাল ডজ' নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রথম মুসলিম নারীদের নিলাম করা শুরু করেছিল। এই ঘটনাতে কেউ তেমন উচ্চবাচ্য করেননি। 

গ) সুল্লি ডিলস

এরপর ২০২১ সালের জুলাই মাসে 'সুল্লি ডিলস' নামের একটি অ্যাপে ৮৩ জন মুসলিম নারীর ছবি দিয়ে নিলাম শুরু হয়। টুইটার থেকে নাম, ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে অ্যাপে দেওয়া হয়।

ঘ) বুল্লি বাই

২০২২ সালের পহেলা জানুয়ারি  যে সমস্ত স্বাধীনচেতা সফল মুসলিম নারীগণ, অনেক সময় আমাদের সরকার রাজের সমালোচনা করেছেন তাঁদের আপত্তিকর ভাবে ‘নিলামে’ তোলা হয়েছিল। প্রায় একশো নারীর  ছবি 'বুল্লি বাই'অ্যাপে আপলোড করা হয়েছে।

ঙ) হিজাব বিতর্ক

মুসলিম নারীদের হেনস্থা করার নতুন আরেক পন্থা 'হিজাব বিতর্ক'। কর্ণাটকে এমন এক ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে  তিনদিন ১৪৪ ধারা জারি রাখতে হয়েছিল।

'সাত দুগুণে চোদ্দর নামে চার, হাতে রইল পেনসিল।'

হাতে পেনসিল নিয়ে, ভাবতে থাকি- 'হোয়াট নেক্সট!' একে ম্লেচ্ছ, তার উপরে নারী এইসকল অপবাদ দিয়ে সকল মুসলিম নারীদের সরকার বাহাদুর কালাপানি পার করাবেন নাকি রে বাবা! এক সে বড়কার এক চকমা দিয়েই চলেছেন সরকার রাজ! বিগত কয়েকবছর ধরে যে সকল হেনস্থার ঘটনা ঘটছে তার বিরুদ্ধে আমরা কতখানি সরব হয়েছি?

ঐদিকে চলছে দড়ি টানাটানি খেলা, এইদিকে চলছে হিন্দু-মুসলমানের গোলকধাঁধা। এইসবের মধ্যে থেকে মুসলিম নারীদের যাঁতাকলে ফেলে চলছে পেষণ! তাই অঘটন ঘটন পটিয়সীদের নীরবতা,নির্লিপ্ততা এবং পিতৃতান্ত্রিক নকশার খোলস থেকে বেরিয়ে নিজের অধিকার বুঝে নিতে হবে! 

লেখক : প্রাবন্ধিক, সমাজকর্মী

ছবি : সংগৃহীত

0 Comments

Post Comment