পৈতৃক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীদের প্রতি বৈষম্য : আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা/পর্ব-৩ 

  • 31 January, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 740 view(s)
  • লিখেছেন : সফি মল্লিক
নারীর অধিকার নিয়ে বিপুল বিতর্কে গোটা পৃথিবী জুড়েই নারীর ক্ষমতায়নের প্রধান অস্ত্র হিসাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পত্তির উপর নারীর অধিকারের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শেষ ও একবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই আন্তর্জাতিক আইন ও অধিকার সংস্থাগুলো সুপারিশ করছে বৈষম্য মূলক আইনগুলি দূর করে রাষ্ট্রব্যবস্থা আধুনিকীকরণের।

পর্ব-৩

ধর্মীয় সংগঠনের বাইরে থেকে সংস্কারের সম্ভাবনা 
ধর্মীয় রীতিনীতির বাইরে থেকে নারী-‌পুরুষের সমানাধিকারের প্রশ্ন বিপুল সংখ্যক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারী ও পুরুষ সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকার হিসাবে ছিনিয়ে নিতে পারে। ইসলামিক জগতের বাইরে গত শতাব্দীর শেষ দশকে হংকংয়ে  নারী আন্দোলনের মাধ্যমে সম্পত্তিতে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়াটি আলোচনা করা যেতে পারে উদাহরণ হিসাবে। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে সম্পত্তিতে মেয়েদের উত্তরাধিকারে সমানাধিকার নিয়ে তীব্র চর্চা শুরু হয়। সেই সময় হংকং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা থেকে রূপান্তরিত হচ্ছিল। হংকংয়ের আশেপাশে চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম— এরকম অনেক দেশেই পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের সমানাধিকার স্বীকৃত হলেও হংকংয়ের নিউ টেরিটোরি অঞ্চলে পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের কোনও অধিকার ছিল না। হংকংয়ের সেই অঞ্চলের মাত্র একজনের একটি ঘটনা থেকে কীভাবে নারী আন্দোলনের এক সুনামির সৃষ্টি হয় এবং শেষ পরিণতি হিসাবে সম্পত্তির উত্তরাধিকারে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, সামাজিক প্রক্রিয়া ও গতিশীলতা নিয়ে উৎসুক যে কোনও মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।
 
১৯৯৪ সালে আইন পরিবর্তন করার দাবিতে একদল গ্রামীণ আদিবাসী মহিলা হংকংয়ের মহিলাদের দলগুলির সাথে যোগ দিয়েছিলেন। এই আন্দোলন একটি অধিকার আন্দোলন নিয়ে বিশ্বব্যাপী মতাদর্শ কীভাবে দুনিয়াজোড়া দাবি-দাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে এক ধরনের সংহতি নির্মাণ করছে তার এক আদর্শ পাঠ্যবিষয়। আন্তর্জাতিকভাবে নারীর উত্তরাধিকারের আন্দোলনগুলি অনেক স্বতন্ত্র স্তরের জোট হিসাবে দেখা হয়। একটি ধারণা প্রচলিত যে, বিশ্বব্যাপী ধারণার প্রচলন সাংস্কৃতিক একজাতীয়তা বৃদ্ধি করছে। 

হংকং মহিলা আন্দোলনের অনুঘটক ছিলেন লাই-শেইংচেং নামে এক আদিবাসী মহিলা। কোনও উইল ছাড়া (আমাদের দেশেও উইল না করার সংখ্যাটাই বেশি) চেংয়ের বাবা মারা যান। তখন স্বাভাবিকভাবে তাঁর দুই ভাই বাড়ির দখল পান। ১৯৯১ সালের মে মাসে তাঁর দুই ভাই বাড়িটি এক প্রোমোটারকে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সম্পত্তির মালিকানার অধিকার না পেলেও সেখানের কাস্টমারি আইন অনুযায়ী অবিবাহিত মেয়ে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে আজীবন বসবাস করার অধিকারী। চেং দাবি করেন সম্পত্তি বিক্রির একটি অংশ তিনি না পেলে বাড়িটির দুইতলায় যে ঘরে তিনি থাকতেন সেটি তিনি ছাড়বেন না। দেশে দেশে দুর্জন প্রমোটারের মতই সেই প্রোমোটার মিস চেংকে বহিষ্কার করতে উৎপাত শুরু করেন। মাঝে মাঝেই তাঁর বাড়িতে প্রোমোটারের লোক ঘরে ঢুকে ইঁদুর ছেড়ে দিয়ে আসত বা দরজায় জানালায় পেচ্ছাব করে দিয়ে চলে আসত। ব্যাপারটা একজন বাউন্ডুলে দুর্বৃত্তের আর একজন মহিলার উপর তাণ্ডব ছিল। এই তান্ডব ও উৎপাত এতটাই মাত্রা ছাড়ায় যে মহিলাকে প্রতি রাত্রেই পুলিশে খবর দিতে হত। তারপর একদিন তিতিবিরক্ত হয়ে হংকংয়ের গভর্নরকে চিঠি লেখেন। কোনও সাড়া না পেয়ে সমস্ত কিছুর বর্ণনা করে একটি চায়না পত্রিকায় চিঠি লেখেন। পত্রিকা চিঠিটি প্রকাশ না করে হংকংয়ের একটি মহিলা সংগঠনের নেত্রী লিন্ডা ওয়ং-এর সঙ্গে মিস চেংয়ের যোগাযোগ করিয়ে দেয়। মহিলা সংগঠনের সেই নেত্রীরা তখন মহিলাদের দাবি দাওয়া নিয়ে একটি কমিশন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছিলেন। 

চেং মহিলা সংগঠনের নেত্রী লিন্ডার সঙ্গে দেখা করে তাঁদের আদিবাসী সমাজের আরও বেশ কয়েকজন একই রকম পরিস্থিতিতে আছেন সেটি জানান। ১৯৯৩ সালের শেষ দিকে সেইসব  আদিবাসী মহিলাদের একত্রিত একটি মিটিং হয় এবং ইস্যুটি শক্তপোক্ত ভাবে ফ্রেমিং করা শুরু হয়। একদিকে গ্রামীন আদিবাসী মহিলাদের রুটি রুজি ও প্রাণের ইস্যু, পিছনে হংকংয়ের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত গ্লোবাল মহিলাদের সাপোর্ট। আদিবাসী মহিলারা যে পরিমাণ নিজেদের মধ্যে সংগঠিত হচ্ছিলেন তার সাথে বিষয়টি রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্রের দিকে আসতে শুরু করে। প্রায় এক দশক থেকে ঐ অঞ্চলের মহিলাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে বৈষম্যের শহুরে চর্চা ছিলই, সেই সময় তা নতুন গতি পেয়ে যায়। 

১৯৯১ সালের জেনেভায় মানবাধিকার কমিটির কাছে আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) সঙ্গে সাযুজ্য রেখে হংকংয়ের মহিলা পরিষদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের একটি প্রতিবেদনের পরে নারীর উত্তরাধিকারের বিষয়টির চর্চা আরও বেড়ে যায়। এই প্রতিবেদনটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের বিষয়টিকে মানবাধিকারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। প্রতিবেদনের চারজন লেখিকার প্রত্যেকের পশ্চিমি আধুনিক শিক্ষার একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। তাঁদের মূল বক্তব্য ছিল পুরুষ কেন্দ্রিক উত্তরাধিকার জাতিসংঘের বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে যায়। হংকংয়ের আইনসভায় এই একাডেমিক ব্যক্তিরা ফরমালি অভিযোগ জানান। একদিকে আইনসভায় তর্ক-বিতর্ক, সংবাদপত্রে প্রবন্ধ, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে মহিলা আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে The Anti-Discrimination Female Indigenous Residents Committee নামে একটি কমিটি তৈরি হয়। প্রথম দিকে এই সংগঠনে যেসব আদিবাসী মহিলারা চেংয়ের মত দুরবস্থায় ছিলেন সেটিকে একান্ত ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের পৈতৃক বা বৈবাহিক আত্মীয়-স্বজনদের করা ব্যক্তিগত অবিচার বলে ধরে নিতেন। আইনসভার বাইরে মহিলা সংগঠনের নেত্রী ওয়ংরা এইসব মহিলাদের নিয়ে প্রথম যে জনসভাটি করেন তার আগে পর্যন্ত এই মহিলারা আইন পরিবর্তন করে নিজেদের দুর্দশার কথা ভাবেননি, তখনও পর্যন্ত তাঁরা আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক অন্যায় ও অবিচারের থেকে একটু ন্যায় চাইতেন। আত্মীয়-স্বজনদের কাছে রক্তের সম্পর্ক থেকে ন্যায় পাওয়া তাঁরা দয়া বা করুণা হিসাবেই দেখছিলেন, সমানাধিকারের ভিত্তিতে নয়। মহিলা সংগঠনের নেতৃত্বে এই আদিবাসী মহিলারা তাঁদের আত্মীয়তার অভিযোগগুলি অধিকার এবং সাম্যের ভাষায় অনুবাদ করতে শিখলেন। এই শিক্ষাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন ছিল, নিরন্তর রাজনৈতিক প্ররোচনার মাধ্যমে সাফল্য ছুঁতে হলে মহিলাদের প্রয়োজনটা যাঁরা শুনছেন তাঁদের কাছে ঠিক ভাষায় পৌঁছানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইনসভা বা মিডিয়া পারিবারিক কোলাহল বা কাদা ছোড়াছুঁড়ি শুনতে পছন্দ করবে না বরং ব্যাপক অর্থে লিঙ্গ সাম্য, মানবাধিকার নামক শব্দগুলি শুনতে অনেক স্বচ্ছন্দ হবে। মহিলাদের ব্যক্তিগত অভিযোগ ও আবেগ অতিক্রম করে তথাকথিত “অভিজাত” ভঙ্গিতে নিজেদের উপস্থাপন করতে “elitist and rational pose” দিতে “শিখতে হয়েছিল”। যদিও মহিলা সংগঠনের নেত্রীরা দাবি করেছিলেন আদিবাসী মহিলারা নিজেরাই সবকিছু শিখে নিয়েছিলেন, শহরের মহিলা সংগঠন শুধু কিছু রিসোর্সের জোগান দিয়েছিল, তবু ব্যাপারটা অবশ্যই অনেক জটিল। 

আদিবাসী মহিলাদের দুঃখের গল্পগুলিকে ঠিকঠাক ফ্রেমিং করতে রাজনৈতিক ভাষায় বহিরাগতরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, গল্পগুলিকে সাধারণীকরণ-এর মাধ্যমে অধিকারের ভাষায় ট্রান্সলেট করতে। এই মহিলা নেতৃবৃন্দরা আদিবাসী মহিলাদের পাবলিকলি কথা বলার সময় স্ল্যাং না ব্যবহার করাও শিখিয়েছিলেন। তাঁদের সমস্যা নিয়ে মধ্যস্থতাকারী বা একটু আধটু সুবিধা পাওয়ার পরিবর্তে অন্যায্য আইনের ব্যাপক পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করতে শেখেন। অনেক অনুষ্ঠানেই গ্রুপের বহিরাগত মহিলারা আদিবাসী মহিলাদের কীভাবে মিডিয়া সামলাতে হবে, বিশেষ করে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দিতে হবে ধরে ধরে শিখিয়েছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন যে মহিলারা তাঁদের ব্যক্তিগত গল্প বলার চেয়ে স্ট্যান্ডার্ড দাবির পুনরাবৃত্তি করুক, যাতে আন্দোলনটি কেবল ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার অনুপ্রেরণার দিকটি সবার আগে উপস্থিত না হয়। বিশেষ করে তাঁদের অনেককে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় যে, ‘আপনার মত মহিলার পৈতৃক সম্পত্তির কোনও দরকার হওয়ার কথা নয়, তবু আপনি এই আন্দোলনের সমর্থনে দাঁড়াচ্ছেন কেন’, ‘আপনার নিজের জীবনে এমন কী অভিজ্ঞতা হয়েছে যে বাপের সম্পত্তির জন্য এরকম উঠেপড়ে আপনাকে নামতে হয়েছে?’ এক অধিবেশনে, সমাজকর্মীরা এই প্রশ্নটি করার সময় সাংবাদিকদের সুর অনুকরণ করেছিলেন এবং একজন মহিলার দেওয়া প্রতিক্রিয়াটি রেকর্ড করেছিলেন। তারপরে তিনি সেই রেকর্ডটি অন্য মহিলাদের মাঝে শুনিয়ে ব্যাখ্যা করতে থাকেন একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত কাহিনীকে বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার কী রকম অসীম প্রভাব হতে পারে। এইভাবে মানবাধিকার ও সাম্যের প্রশ্নে উদবুদ্ধ করার ফলে সেই গ্রুপের একজন মহিলা পালিত কন্যা হয়েও তাঁর পালিত পিতার ঔরস জাত সন্তানের কাছ থেকে পৈতৃক সম্পত্তির দাবি রাখেন। 

এছাড়া মহিলা সংগঠন তাঁদের দাবিদাওয়া নিয়ে শিল্প, সাহিত্য, পপুলার ডিমনেস্ট্রেশন-এ ভূমিকা তো রেখেইছিলেন। ঐতিহ্যের ধ্বজা ধরে, প্রাচীন সংস্কৃতির নাম করে, আইন সংস্কারের বিরুদ্ধে যা কিছু বিরোধী মতামত ছিল সব পরাস্ত হয়। টিভি প্রোগ্রাম, গল্প, নাটক সব কিছুতেই একমাত্র পুরুষের মারফত বংশ পরম্পরায় উত্তরাধিকারের রীতিকে ব্যাকডেটেড, ফেউডাল ব্যবস্থা হিসাবে চিহ্নিত হতে থাকে। অন্যদিকে মহিলাদের দাবিদাওয়াগুলি আধুনিকতা ও প্রগতি হিসাবে চিহ্নিত হয়। আদিবাসীদের পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার না থাকাকে “ট্র্যাডিশন” ও “পুরুষতান্ত্রিকতার” শিকার হিসাবে ধরা হতে থাকে। আইন সংস্কারের বিপক্ষে যাঁরা ছিলেন তাঁরা প্রথম থেকে দেখাতে  চাইছিলেন, যে পরিবারে শুধু মহিলা সন্তান আছে এবং ঐ বিশেষ কিছু আদিবাসীদের সমস্যা, কয়েকজনের সমস্যা। এগুলির সমাধান কেস বাই কেস ধরেই করে দেওয়া যায়। মেয়েরা বিয়ের পর যেহেতু অন্য সংসারে চলে যায় তাই সার্বজনীন ভাবে মেয়েদের জন্য সমানাধিকারের দরকার নেই। 

মহিলা সংগঠনের প্রতিষ্ঠিত একাডেমিসিয়ানদের নিরন্তর পরিশ্রমের ফলে ততদিনে আদিবাসী মহিলারা নিজেদের কথাকে সাধারণীকরণ করে বৃহত্তর প্রেক্ষিতে নিজেদের ভাষায় বলতে শিখে গিয়েছিলেন। আইনসভার বেশ কয়েকজন এই সময় আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে বিস্মিত হয়েছিলেন। বহিরাগত মহিলাদের প্রভাবে আইন পরিবর্তনের এই আন্দোলনকে অনেকেই আদিবাসী মহিলাদের রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার হিসাবে অভিযোগ খুব সহজে করতেই পারেন, কিন্তু সেই অভিযোগ ধোপে টেকে না কারণ সময়ের সাথে আদিবাসী মহিলারা নিজেরাই স্ট্রাটেজি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে থাকেন। যেমন আন্দোলন নিয়ে গান রচনার চিন্তা আদিবাসী মহিলারা নিজেরাই করেন। আদিবাসী মহিলাদের বানানো ট্র্যাডিশনাল গান এই আন্দোলনে আইকনিক মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। এই মহিলারা যখন তাঁদের সমস্যাগুলি জ্ঞাতিবর্গ মানুষদের বঞ্চনার কাহিনী থেকে মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে বৈষম্য ও লিঙ্গ অসাম্যের ধ্যানধারণাকেও অঙ্গীভূত করে নেন তখন সেটি চেতনার নতুন স্তরে পৌঁছে যায়। চেতনার নতুন স্তরে পৌঁছেও এই মহিলারা কিন্তু তাঁদের পুরুষ আত্মীয়দের করা অবিচারের কথা কোনও সময়ের জন্য বিস্মৃত হননি। যেহেতু চেতনা একটি অস্পষ্ট শব্দ যাকে পরিমাপ করা যায় না, তাই ঠিক কীভাবে লিঙ্গ-সাম্যের ধারণায় এই মহিলারা নিজেদের মিশিয়েছিলেন সেটা বলা খুব কঠিন। 

এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আগে অনেক মহিলাই ছিলেন যাঁরা “gender discrimination”, “injustice” শব্দগুলি কখনও শোনেননি। কিছু আদিবাসী মহিলাদের সমস্যা যেভাবে উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তনের দাবিতে উন্নীত হয়েছিল, সেই গল্পটি দেখায় যে, স্থানীয় অভিযোগগুলির মোকাবেলায় কীভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের প্রশ্নকে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এই যাত্রা শুধুই কিছু শহুরে বহিরাগত এলিট মহিলার অধিকার আন্দোলনের বাচনকে ইম্পোজ করার মত সরলও ছিল না। আসলে অধিকার আন্দোলনের ভাষার বহু গ্রহণ, বর্জন, উপেক্ষা, পরিবর্তনের মাধ্যমে আত্মীকরণ হয়েছিল। যাঁরা একাডেমিক্যালি চর্চা করেন তাঁরা এই আন্দোলনটিকে তিনটি লেয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সম্মিলনের ফল হিসাবে দেখেন—
১) প্রবাসী মানুষরা বিষয়টিকে চর্চার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে ভূমিকা নিয়েছিলেন, এঁরা মূলত একাডেমিক ও আইনজীবী ছিলেন যাঁরা আদিবাসী অনেক মহিলাদের আইনি সহায়তা দিতেন।
২) বিষয়টি যখন আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায় তখন আইনসভার সদস্যরা আইন পরিবর্তনকে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার প্রশ্নের মধ্যে নিয়ে চলে আসেন, যা আইন পরিবর্তনের পক্ষকে শক্তিশালী করে।
৩) মহিলা সংগঠনগুলি, যারা আইনসভা, আদিবাসী মহিলা এবং আন্দোলনের মধ্যে যোগসূত্র নির্মাণ করেন। আর, সবার উপরে ছিল—
৪) আদিবাসী মহিলারা যাঁরা এই আন্দোলনের সব থেকে নিচের শ্রেণি।
হংকংয়ের এই আন্দোলনকে খুঁটিয়ে পাঠ করার পরে আমরা আবার আমাদের দেশের আলোচনায় ফিরে আসলে, চেংয়ের মত একজন ব্যক্তি বা তাঁর সঙ্গে আরও বেশ কিছু মানুষ যেভাবে আত্মীয়-পরিজনদের অন্যায়ের স্বীকার হয়েছিলেন সেরকমই ঘটনা কি আমরা দেখতে পাইনা? যেভাবে তিন তালাক নিয়ে কিছু মানুষের সমস্যা কয়েক বছর ধরে ভারতে চর্চিত ছিল, সেটিকে মূলধারার ইসলামিক সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গেরা বলতে থাকেন ‘কয়েক জন মানুষের করা অপরাধ, বা ইসলামি আইনও অমান্য করা কিছু ব্যক্তির অপরাধ যা মুসলিম সমাজের বাইরেও অনেকে করে থাকেন ও পার পেয়ে যান‌।’‌ দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে ইসলামি আইন মানা কোনও সংগঠনকে, অধিকার আন্দোলনের প্রশ্নে সেই দুর্ভাগা মহিলাদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। এমনকি অন্যায়ভাবে তিন তালাকের শিকার মহিলাদের ইস্যুটি তথাকথিত প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক শিবির যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। যে কারণে সুবিধা নিয়েছিল বিজেপি। সেই সময় ভিক্টিমরা মিডিয়ার সামনে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে অনেক জড়তার সম্মুখীন হতেন, যদি তাঁদের কোনও কথা বিজেপি এনক্যাশ করে নেয়। হংকংয়ের উদাহরণে আইন পরিবর্তন না করে বিচার ব্যবস্থার মধ্যে থেকে কেস বাই কেস বিচারের ব্যবস্থা একদম ছিল না তা নয়, তবু তাঁরা সেই সমস্যাটা কেস বাই কেস সুবিচারের পথে না গিয়ে তাঁরা সার্বিক আইন পরিবর্তনের পন্থাটি গ্রহণ করেন। 

ইসলামি আইন সম না সুষম সেই বিতর্কে না গিয়ে ইসলামের ভিতর থেকে সম্পত্তির প্রশ্নে লিঙ্গ সাম্যের প্রশ্নটি ধর্মীয় আইনের নতুন ব্যাখ্যার মাধ্যমে উত্থাপিত না হলে সেটি ইসলামের বাইরে কোন পথে হবে আমি জানি না। এটা ঠিক, বঞ্চনা যদি একিউট না হয় তাহলে মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার আগুন সহজে জ্বলে ওঠেনা।  যে সমাজে শুধুই পুরুষলাইন ধরে বংশ পরম্পরায় সম্পত্তির উত্তরাধিকার ট্র্যাডিশনের নামে দীর্ঘদিন চলে এসেছে, নারী-পুরুষের সম অধিকারের ভাবনা গড়ে উঠছে না, সেই মুসলিম সমাজ থেকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এলিট মুসলিমরা আইন পরিবর্তনের পক্ষে জনমত তৈরি করবেন, নাকি বিরোধী কোন দল তাঁদের হয়ে আইন নিয়ে আসবে সেই অপেক্ষায় থাকবেন?  

 ‌

পরের পর্বের জন্য লক্ষ্য করুন আমাদের ওয়েব পোর্টাল sksew.com 

 

পুনঃপ্রকাশ, প্রথম প্রকাশ ৬ জুলাই ২০২০

প্রতীকী ছবি

লেখক: অধ্যাপক

সৌজন্য:‌ ‘‌সহজিয়া’‌ ২০২০ ইদসংখ্যা

0 Comments

Post Comment