মুসলিম মেয়েও পৈতৃক সম্পত্তির সমান ভাগ পাবে

  • 16 February, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 674 view(s)
  • লিখেছেন : আফরোজা খাতুন
আত্মস্বার্থ পূরণ করতে বহু মানুষ ধর্মকে ব্যবহার করে। ছেলে-মেয়েকে সম্পত্তির সমান ভাগ দিলে গুণহা (পাপ) হবে এমন কথা ধর্মগ্রন্থে লেখা নেই। এক বাড়ির দুই ভাই-বোন অফিসে একই পোস্টে কাজ করার জন্য সমান মাইনে দাবি করবে। তখন ভাই নিশ্চয় বলবে না, মেয়েদের কম মাইনে নিতে হয়।  বাইরে সম কাজের সম মূল্য অর্জন হোক চাইবে কিন্তু বাড়িতে অর্ধেক সম্পদ বর্জন করতে কেনো বলবে?

রুবিয়ার স্বামী চেয়েছিলেন ছেলে-মেয়েকে সম্পত্তির সমান ভাগ দেবেন। একই ভাবে মানুষও করেছেন দুই সন্তানকে। পৈতৃক সম্পত্তিতেও ছেলে-মেয়ের সমান ভাগ থাকা মানবিক ধর্ম বলেই জানতেন। কিন্তু আচমকা মৃত্যু হল রুবিয়ার স্বামীর। রুবিয়া জানতেন সম্পত্তির সম-বণ্টনে বাড়িতে কোনও অশান্তি হবে না। ছেলে-মেয়েদের    মানসিক গড়ন সেইভাবেই তৈরি। তাঁদের ছেলের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মেও বিশ্বাস ছিল  নেই। নিজেকে মুক্তমনা উদার মানুষ বলেই চিহ্নিত করতেন। পিতার মৃত্যু তাঁকে বদলে দিল। জানিয়ে দিলেন তিনি ইসলাম ধর্মের নিয়ম মেনেই চলবেন। কারণ এখন এই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাশ্রয় তাঁর জন্য লাভজনক। পিতা-মাতার সম-অধিকারের মানবিক তত্ত্ব মানতে গেলে, বোনের দ্বিগুণ সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে। ঈশ্বরে অবিশ্বাস, ধর্মে অনাস্থা সব ফিকে হয়েছে পৈতৃক সম্পত্তিতে বোনের সমান অধিকার মানবেন না বলে।

রুবিয়া বললেন, ‘স্বামী হারানোর ব্যথাকে ভুলিয়ে দিয়েছে ছেলে। সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য ছেলের ভোল বদলে যে আঘাত পাচ্ছি, স্বামী হারানোর চেয়ে বেশি। কোনও ধর্মাচরণে বিশ্বাস নেই। নিজেকে বিশেষ কোনও ধর্মের বলে পরিচয় দিতে আপত্তি ছিল। এখন বোনকে ফাঁকি দেবে বলে মুসলমান হল। কোন যুক্তিতে ছেলে বেশি পাবে? একইভাবে ছেলে-মেয়ের জন্ম। সমানভাবে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। ভালবাসাও একই। ওরাও সমান ভালোবাসার অধিকার নিয়ে আব্বা-মায়ের কাছে আবদার করে। তাহলে তফাৎ কোথায়? এই আইনের বৈষম্যে আমার মেয়ে হচ্ছে বঞ্চিত। আমার মৃত স্বামীর সম্পত্তি ছেলে-মেয়ের মধ্যে সমান ভাগ করে দেওয়ার আইন আমার হাতে নেই। আমার মেয়ে অপমানের দহনে পুড়ছে। তার চেয়ে বেশি পুড়ছি আমি। এদেশে দ্রূত সেই আইন করা দরকার, যেখানে মুসলিম মেয়েও পৈতৃক সম্পত্তির সমান ভাগ পাবে।’

আত্মস্বার্থ পূরণ করতে বহু মানুষ ধর্মকে ব্যবহার করে। ছেলে-মেয়েকে সম্পত্তির সমান ভাগ দিলে গুণহা (পাপ) হবে এমন কথা ধর্মগ্রন্থে লেখা নেই। এক বাড়ির দুই ভাই-বোন অফিসে একই পোস্টে কাজ করার জন্য সমান মাইনে দাবি করবে। তখন ভাই নিশ্চয় বলবে না, মেয়েদের কম মাইনে নিতে হয়। বরং সম মাইনের দাবিতে আন্দোলনে সামিল হতে পারে। সাম্প্রতিককালে এই চিত্রটাই স্বাভাবিক। বাইরে সম কাজের সম মূল্য অর্জন হোক চাইবে কিন্তু বাড়িতে অর্ধেক সম্পদ বর্জন করতে কেনো বলবে? কোরান শরিফে আছে, ‘আর সম্পত্তিভাগের সময় আত্মীয়স্বজন, পিতৃহীন বা অভাবগ্রস্ত লোক উপস্থিত থাকলে তাদের তার থেকে (কিছু) দাও; আর তাদের সঙ্গে ভালো কথা বলো।’ (৪ সুরা নিসা) কোরানের এই নির্দেশ ক’জন মেনে চলেন? মেয়েকে ভাগ কম দেবার বেলায় ধার্মিক হতে হয়। পৈতৃক সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যার সম-অধিকার দিলে ধর্মে আঘাত পড়ে কীভাবে? সংস্কারের কথা ভারতের মুসলিম সমাজের ভাবার সময় হয়েছে। 

প্রতীকী ছবি

লেখক : অধ্যাপক ও সমাজকর্মী 

 

0 Comments

Post Comment