রাজনৈতিক আন্দোলনের পুরোধা জোবায়দা খাতুন চৌধুরী

  • 01 May, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 598 view(s)
  • লিখেছেন : আফরোজা খাতুন
১৯২৮ সাল। সিলেটে এক সম্মেলনে অতিথি হয়ে এসেছেন কাজী নজরুল ইসলাম, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। মেয়েদের বসানোর ব্যবস্থা হয়েছিল পর্দার আড়ালে। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম গাইছেন উদ্বোধনী সংগীত। ঠিক সেই সময় জোবায়দা খাতুন চৌধুরী টান মেরে খুলে দিয়েছেন মেয়েদের আড়াল করে রাখা পর্দা। তারপর খুলে ফেলেছেন নিজের বোরখা। এমন বিদ্রোহ আগে কেউ দেখেননি।

আসামের জোড়হাট জেলায় ১৯০১ সালে জোবায়দা খাতুন চৌধুরীর জন্ম। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ডিব্রুগড়ে লোয়ার প্রাইমারি স্কুলে ১৯০৫ সালে। কিন্তু সেই বছরই ইংরেজ সরকার বঙ্গদেশ বিভক্ত করে। পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় সরকারি কাজ চালানোর জন্য নানা জায়গা থেকে সরকারি কর্মচারি নিয়ে যাওয়া হয়। ডিব্রুগড় থেকে জোবায়দা খাতুন চৌধুরীর পুলিশ ইন্সপেক্টর পিতা সরাফত আলীকেও ঢাকাতে পাঠায়। ফলে জোবায়দা খাতুনকেও পরে ঢাকার ইডেন গার্লস হাই স্কুলে পড়তে হয়।

জোবায়দা খাতুনের শৈশব-কৈশোরে বাংলায় শুরু হয়েছে স্বাদেশিকতার ঢেউ। তাঁর কিশোরী মন এই অভিঘাত এড়াতে পারেনি। তখন থেকেই জোবায়দা খাতুনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ভবিষ্যতে সক্রিয় রজনৈতিক কর্মী হওয়ার। আর এই প্রস্তুতির উৎস ছিল দেশপ্রেমমূলক গ্রন্থ পাঠ। ১৯১৯ সালে আঠারো বছর বয়সে আবদুর রহিম চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর আরও বেশি করে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। প্রকাশ্য জনসভায় তাঁর প্রথম উপস্থিতি ১৯২১ সালে সিলেটে। দেশে তখন খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন চলছে। সিলেটের জনসভায় এসেছেন মহাত্মা গান্ধী। মহিলাদের পর্দার আড়ালে বসার ব্যবস্থা হয়েছে। সমাজের সেই ব্যবস্থা মেনেই বোরখা পরে  আড়ালে বসে বক্তব্য শুনলেন জোবায়দা। তবে মেয়েদের জন্য এই বিধান মেনে বেশিদিন চলেননি তিনি। ১৯২৮ সাল। সিলেটে এক সম্মেলনে অতিথি হয়ে এসেছেন কাজী নজরুল ইসলাম, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। একই নিয়মে পর্দার আড়ালে মেয়েরা বসবে। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম গাইছেন উদ্বোধনী সংগীত। ঠিক সেই সময় জোবায়দা খাতুন চৌধুরী টান মেরে খুলে দিয়েছেন মেয়েদের আড়াল করে রাখা পর্দা। তারপরই খুলে ফেলেছেন নিজের বোরখা। ‘পুরোপুরি পর্দামুক্ত মহিলা হিসেবে নির্বিকার বসে আছেন তিনি। না, নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না কেউ কেউ। একজন মাত্র মহিলা এরকম একটা ঝুঁকি নিতে পারেন তা অবিশ্বাস্যই বটে। সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতেই পারে। বিশেষ করে চিকের আড়াল সরিয়ে দেওয়ার পর আবার নিজেকে বোরখামুক্ত করে আরও শতগুণ বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন তিনি। পশ্চাৎপদতা, অন্ধ গোঁড়ামি ও কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে অনেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও এমন বিদ্রোহ কখনও দেখেনি কেউ।’ (তাজুল মোহাম্মদ- জোবায়দা খাতুন চৌধুরী : সংগ্রামী নারীর জীবনালেখ্য, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, পৃ ১৯) তবে দর্শকভর্তি  সভায় পর্দাপ্রথা ছিন্নের বিদ্রোহ দেখানোর পরই একটা অস্বস্তি চেপে ধরে তাঁকে। কিন্তু সে অস্বস্তির হাত থেকে মুক্তি মেলে পিতা সরাফত আলী চৌধুরী ও স্বামী আবদুর রহিম চৌধুরীর প্রশংসা পেয়ে। শুরু হল তাঁর রাজনৈতিক জীবন। ১৯২৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিলেন। এর দু’বছর পরই সিলেটে তৈরি হল কংগ্রেসের মহিলা শাখা। সভানেত্রী হলেন জোবায়াদা খাতুন চৌধুরী। তাঁর নেতৃত্বে মহিলারা সংগ্রামী আন্দোলনে রাজপথে নামেন।

২ জানুয়ারি ১৯৩০ সাল, কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ঠিক হয় ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস পালন করা হবে। ঘোষণামতো ২৬ জানুয়ারি মিছিল এবং সভা আয়োজনে জোবায়দা খাতুন চৌধুরি ছিলেন সামনের সারিতে। পরের বছরেও তিনি শোভাযাত্রার ব্যবস্থা করে পুলিশি বাধার সামনে পড়েন। তাঁর অনড় মনোভাবকে টলাতে পারেনি পুলিশের আক্রমণ। পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়ে সহযোদ্ধাদের স্বাধীনতা আদায়ের শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছেন। জোবায়দা খাতুন সিলেটে গড়ে তোলেন দুর্বার স্বদেশী আন্দোলন। লাগাতার চলে তাঁর নেতৃত্বে পিকেটিং ও মিছিল। বিদেশি দ্রব্য বর্জন, মিলে তৈরি বস্ত্র বর্জন আর খদ্দরের পোশাক গ্রহণ, এই প্রচার চালিয়েছেন। নিজে খদ্দর পরা শুরু করেন এবং দলীয় কর্মীদের পরতে উদ্বুদ্ধ করেন। এমনকী বাড়ি বাড়ি চরকায় সুতা কাটা শুরু করান। সিলেট জেলা মহিলা কংগ্রেসের সভানেত্রীর দায়িত্বে থেকে অনেকগুলো বছর মহিলাদের নিয়ে সক্রিয় সংগ্রামের ময়দানে কাজ করেছেন। এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিলেন ১৯৩৫ সালে। কমিউনিস্ট পার্টির তৈরি মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সিলেট শাখার সক্রিয় সংগঠকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জোবায়দা খাতুন চৌধুরী। আত্মরক্ষা সমিতির সম্মেলনের সভামুখ্যও হয়েছিলেন। এরপরে জোবায়দা খাতুন যুক্ত হন মুসলিম লীগে।

দেশ ভাগ হওয়ার পর পাকিস্তানের মহিলা সংগঠন আপওয়া-র (অল পাকিস্তান  উম্যানস অ্যাসোসিয়েশন) মতো গুরুত্বপূর্ণ দলের সিলেট জেলার সভানেত্রী নির্বাচিত হন জোবায়দা খাতুন চৌধুরী। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক ছিলেন তিনি। সিলেটের মহিলাদের সংগঠিত করে, তাঁদের নিয়ে মিছিল ও জনসভার আয়োজন তাঁর নেতৃত্বে হয়। জোবায়দা খাতুন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হন ১৯৫৪ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নানারকমভাবে সাহায্য করেছেন। এক সময় আওয়ামী লীগও ছাড়েন। সক্রিয় রাজনীতি আর সামাজিক কাজে প্রায় সারাজীবন তাঁর অতিবাহিত হয়। ২৫ জানুয়ারি ১৯৮৫ সালে নারী জাগরণের অগ্রদূত, স্বাধীনতা আন্দোলনের একনিষ্ঠ সৈনিক জোবায়দা খাতুন চৌধুরী চিরনিদ্রায় শায়িত হন।  

সহায়ক গ্রন্থ:

তাজুল মহম্মদ- জোবায়াদা খাতুন চৌধুরী : সংগ্রামী নারীর জীবনালেখ্য, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০০৮

ছবি : সংগৃহীত

লেখক : কলেজ শিক্ষক ও সমাজকর্মী

0 Comments

Post Comment