মুসলিম জনমানসে ‘‌পারিবারিক কাঠামো’‌র ধারণা এবং ইসলামে নারীর সম্পত্তি

  • 07 July, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 1053 view(s)
  • লিখেছেন : নাসিমা ইসলাম
নারীকে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতে যে-কারণই দর্শানো হোক না কেন, প্রকৃত প্রস্তাবে তা নারীকে পরনির্ভর করে রাখার এক চিরস্থায়ী পিতৃতান্ত্রিক কৌশল। ফলত ইসলামের সদিচ্ছাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছে অসৎ মানুষের মুনাফা লোটার মূলধন। আজকের দিনে তাই প্রয়োজন সম্পত্তির ‘সুষম বণ্টন’-এর স্থলে ‘সম বণ্টন’, পুরুষের সমান নারীর মর্যাদা ও অধিকার, নারীর আত্মনির্ভর ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হয়ে ওঠার প্রশস্ত পরিসর।

বর্তমানে আমরা যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি সেটা হল ইসলামে নারীর সম্পত্তির অধিকার। মূল আলোচনাতে প্রবেশ করার আগে এটা বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, এই আলোচনাটিকে বিভিন্ন ভাবে রূপ দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, শুধুই কোরান–হাদিস ঘেঁটে নারীর অধিকার নিয়ে ইসলাম কোথায় কী বলছে তার বর্ণনা করা। দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে ইসলাম-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে তৎকালীন আরব সমাজে সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীর অবস্থান নির্ণয় করা। সেই সূত্রে ধরেই পর্যালোচনা করা ইসলাম আজ পর্যন্ত কী ধরনের ভূমিকা পালন করছে এবং তার তৎপর্য ঠিক কতখানি। তৃতীয়ত, আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে পারি ইসলাম অনুসারে নারীকে সম্পত্তির যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, তার পিছনে তৎকালীন আর্থ–সামাজিক, ধর্মীয়–সাংস্কৃতিক কারণগুলি। সেই যুগে স্বাভাবিকভাবে স্বীকৃত কারণ বর্তমান যুগে বদলিয়েছে কি না, বা বদলালে ঠিক কতটা বদলেছে এবং যদি বদলে থাকে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুসলিম নারীদের সম্পত্তির অধিকার বিষয়ক আলোচনাটি সম্পূর্ণরূপে পুনরায় বিশ্লেষিত হওয়া প্রয়োজন কি না ইত্যাদি। কিংবা এরকমও হতে পারে, আমরা দেখে নেব, ইসলামের সদিচ্ছাকে উপেক্ষা করে কিছু না-পাক নিয়ৎ বা খারাপ অভিসন্ধির মানুষ কীভাবে ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা করে নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে শুদ্ধমাত্র নিজেদের আখের গুছিয়ে চলেছে। এও আমাদের বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন অসাধু মানুষরা চাইলেই খুব সহজে নিজের মুনাফা লোটার চক্করে ইসলামকে ব্যবহার করতে পারে কি না।

এখন প্রশ্ন, যদি এরকম হয় তাহলে কী করণীয় হতে পারে। কীভাবে নারীর সম্পত্তির ন্যায্য অধিকারকে রক্ষা করা যেতে পারে এবং তা কোন্‌ পথে। বলা বাহুল্য উক্ত সমস্ত দিকই ইসলামে নারীর সম্পত্তি বিষয়ক আলোচনাতে গুরুত্বপূর্ণ এবং কেউ যদি এই দিকগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি দীর্ঘ গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ করতে পারেন, তার থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু বর্তমান লেখাটির সীমাবদ্ধ পরিসরে আমি শুধুমাত্র একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট থেকে এই আলোচনায় প্রবেশ করতে চাইছি এবং সেটি হল ‘পারিবারিক কাঠামো’ সম্পর্কে মুসলিম জনমানসে বিরাজমান ধারণা।

অনেকে মনে করেন যে, ইসলামই প্রথম ধর্ম যা নারীকে স্বীকৃতভাবে সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে। বহু মুসলিম এই নিয়ে ভীষণ গর্ববোধও করেন। ইসলামের এই অভূতপূর্ব অবদানের গুরুত্ব বোঝাতে তৎকালীন বা তার আগের সমাজ ব্যবস্থায় সম্পত্তির অধিকারে নারীর যে করুণ দুর্দশা ছিল তা দেখানো হয়। বলা হয়, ইসলামের আগে আরব, প্রাচীন রোমান বা ইহুদি বিধান অনুসারে নারীকে কোনো সম্পত্তি দেওয়া হত না। এই অমানবিক নিয়মনীতির নিরিখে ইসলামের পদক্ষেপ বেশ যুগান্তকারী। এখানে মনে রাখা দরকার ইসলামের এই পদক্ষেপকে বেশ ‘যুগান্তকারী’ মনে হয় শুধু অতীত সমাজ-ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে। কিন্তু, আজকের দিনে, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সমাজের সম্পত্তির বণ্টন ব্যবস্থার নিরিখে মুসলিম সমাজে নারীর সম্পত্তিলাভের অবস্থানটা ঠিক কোথায়? 

ইসলামে বিভিন্ন পরিস্থিতি অনুসারে সম্পত্তির বণ্টনের বিধান রয়েছে। এর মধ্যে সব থেকে বিতর্কিত হল শরিয়া অনুসারে একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে সম্পত্তির গল্পটি, যেটি টিকে রয়েছে একটি বিশেষ ‘‌পারিবারিক কাঠামো’-র এবং নারী–পুরুষের কর্তব্য–ক্ষমতার বিভাজনের যুক্তির উপর। আমি এই বিষয়টিই আলোচনা করবো। শরিয়া অনুসারে পিতার মৃত্যু হলে তার এক কন্যা ও এক পুত্র থাকলে পুত্র ৩ ভাগের ২ ভাগ ও কন্যা ১ ভাগ পাবে। একাধিক কন্যা ও এক পুত্র থাকলে পুত্র ২ ভাগের ১ ভাগ ও কন্যারা বাকিটা সমানভাবে পাবে। নারী–পুরুষের মধ্যে এই অসম বিভাজনের কারণ হিসাবে সমর্থনকারীরা নিম্নলিখিত যুক্তিগুলি দেন:‌

১. ইসলামের পারিবারিক কাঠামো অনুসারে একজন পুরুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব ও মর্যাদারক্ষার কর্তব্য বেশি। তাই তার সম্পত্তিও বেশি।

২. ইসলাম এই বণ্টনের ক্ষেত্রে ‘সম’ নয় ‘সুষম’ নীতিতে বিশ্বাসী।

৩. নারী বিয়েতে যৌতুক, দেনমোহর পায়, তাই তার আর বেশি সম্পত্তির দরকার নেই।

এবার এই যুক্তিগুলোকে একে একে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক তাদের মধ্যে কতখানি সারবত্তা রয়েছে।

শুরুতেই বলা হচ্ছে যে, একজন পুরুষের নাকি একজন নারীর তুলনায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব বেশি। আচ্ছা, তাহলে প্রথমেই প্রশ্ন করা যাক যে, কেন এরকম ভাবা হচ্ছে? একজন পুরুষের কেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব বেশি হবে? কেন এরকম একটি ‘‌পারিবারিক কাঠামো’‌ ও সমাজ-ব্যবস্থা তৈরি হবে এবং তা আজ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, যেখানে এত সহজে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, একজন পুরুষ বাইরে যাবে, দশটা লোকের সঙ্গে সামাজিক লোকাচার করবে, উঠবে–বসবে, ঘর–সংসারের হিসাবনিকাশ রাখবে। এক কথায় সব কিছুই রাখবে নিজের নিয়ন্ত্রণে। এই সমস্ত কাজ একজন নারী করতে পারে না? নারী কি তাহলে সংসারের দায়িত্ব নেওয়া, খরচপাতির হিসাব করা, বাইরে আত্মীয়–পরিজন লোকাচারের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, সামাজিক কর্তব্য করার ‘দায়’ নিতে অক্ষম? আর তা ছাড়া এটা শুধু পুরুষের ‘দায়’ হতে যাবে কেন? আসলে, ‌‌এতে রয়েছে প্রচুর মজা ও নিয়ন্ত্রণ করার আত্মতৃপ্তি।

যার যত দায়িত্ব তার তত ক্ষমতা, অর্থ, হম্বিতম্বি, মাতব্বরি। তার কথার তত দাম। খেয়াল করে দেখুন, এখানে কীভাবে ঘরে ও বাইরে প্রথম থেকেই একটি পুরুষকে মুখ্য চরিত্র বানানোর প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে যাচ্ছে। আমাদের একবারের জন্যও মনে হয় না যে, ভীষণ ধূর্ত পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি এই সংসারের ভেতরে ও বাইরের ‘দায়দায়িত্ব’ বলে যেটাকে পুরুষের হাতে ছেড়ে দিচ্ছে, তা আসলে ক্ষমতার হস্তান্তর। আসলে এই দায়িত্ব হল ক্ষমতায় আসার উৎস। উদাহরণ স্বরূপ দেখানো হচ্ছে যে, একজন পুরুষ ছোটোবেলা থেকেই ধীরেধীরে বড়ো হচ্ছে যখন, তখন সে তার পাশাপাশি বড়ো হতে থাকা তার বোন বা দিদির থেকে বেশি দায়দায়িত্ব নিচ্ছে। বোনের বিয়ের খরচ, বাবা মায়ের চিকিৎসা, ভরণপোষণের খরচ, বাইরের জগতের লোকাচার, এমনকি তার নিজের বিয়ে করা ‘‌বউ’–এর ভরণপোষণের খরচ, সব তাকে সামলাতে হচ্ছে একা হাতে এবং সেইজন্য তার হাতে বেশি টাকা ও সম্পত্তি দরকার—বোনটির থেকে দ্বিগুণ দরকার। আপাত দৃষ্টিতে খুব ‘স্বাভাবিক’, ন্যায়সংগত লাগছে হিসাবটা, তাই না? কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, এই পুরুষ ভাইটির বর্ণনা দিতে গিয়ে আমরা ভুলে গেলাম যে, এই পুরো বর্ণনাটি যেন কোনো এক অন্য পুরুষের মস্তিষ্কপ্রসূত। যেন কোনো এক পুরুষ, তার ধার নেওয়া কিছু চিন্তা বা কষ্টকল্পনার ভিত্তিতে এই সমস্ত ব্যবস্থাটি বুনে দিয়েছে। এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, যখন ভাইটি বড়ো হচ্ছে, তখন তার দায়দায়িত্ব বাড়ছে। অথচ বোনটির বাড়ছে না। বোনটির কোনো দায়িত্ব নেই, সে বাইরের সমাজে লোকাচারে সক্ষম নয়। বোনটির বিয়েতে পণ ও বিয়েজনিত অনেক খরচ হবে। বোনটি বিয়েতে যৌতুক ও দেনমোহর হিসাবে অনেকটা অর্থ পাবে। বোনটি বিয়ের পর তার বাড়ি ছেড়ে পালাবে, বাবা–মাকে সে দেখবে না। তাদের খরচাপাতি, চিকিৎসা ইত্যাদির দায়িত্ব নেবে না। ভাইটির মতো বোনটিকে তার বিয়ে করা জীবনসঙ্গীকে দেখতে হবে না। ঠিক যেমন ভাইকে তার বিবাহিত স্ত্রীকে দেখতে হয়। সুতরাং এতদ্দ্বারা প্রমাণিত হল যে, ভাইটির দ্বিগুণ অর্থ প্রয়োজন। তাই নারী–পুরুষের মধ্যে শরিয়া অনুসারে এখানে ‘সমবণ্টন’ সম্পন্ন হতে হলে পুরুষ ভাইটিকে নারী বোনটির থেকে বেশি অর্থ দেওয়া ‘ন্যায়সংগত’। কী সুন্দর গল্পটা! পুরুষের দায়িত্ব বেশি তাই চাহিদা বেশি এবং ফলস্বরূপ পুরুষের উত্তরাধিকারজনিত সম্পত্তিতে নারীর তুলনায় অধিকারও বেশি। চমৎকার! বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই পুরো কাঠামো বা ব্যবস্থায় একজন নারীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এই মর্মে যে প্রথম থেকেই ধরে নেওয়া হল, একজন সমকক্ষ পুরুষের তুলনায় তার দায়দায়িত্ব, ক্ষমতা ও অর্থের প্রয়োজনীয়তা কম। সত্যি কি তাই! আচ্ছা যদি এমন হয় যে, বোনটি ভাইটির মতোই সাংসারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দায়দায়িত্ব নিতে সক্ষম, সে আধুনিকমনস্ক এক নারী যে চাকরি বা ব্যাবসা করতে চায় এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিয়ে করতে চায় (বা হয়তো কখনই বিয়ে করতে চায় না)। অথবা ধরুন সে বিয়ে করল যৌতুক না নিয়ে, অযথা লোক দেখানোর খরচ না-করে বা খরচ করল নিজের জমানো টাকাতে। অথবা ধরুন এই বোনটি এমন একজন পুরুষকে বিয়ে করল যে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সংগ্রাম করছে। অথবা স্বামীটি প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও বোনটি তার স্বামীর কাছ থেকে কোনো অর্থ সাহায্য নেওয়া পছন্দ করে না আত্মমর্যাদার কারণে। আরও ধরা যাক ভাইটির কথা, যে তার স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে। এখানে কীভাবে মনে করে নেওয়া হল যে, তার স্ত্রী নিজের ভরণপোষণের খরচ নিজে বহন করতে অক্ষম? ভাইয়ের স্ত্রী যদি স্বাবলম্বী হয় এবং তার স্বামীর মুখাপেক্ষী হতে পছন্দ না করে? পুরুষতন্ত্রের কষ্টকল্পনায় এরকম বিকল্প চিত্রগুলি হয়তো ভীষণ অস্বস্তিকর। কারণ এগুলি এতক্ষণ ধরে দেখানো ভাইটির সপক্ষে বেশি সম্পত্তির ‘সুষম বণ্টন’–এর যুক্তিগুলিকে এক এক করে সব নস্যাৎ করে দিল। একটি ঝড় আনল পুরুষতন্ত্রের রচিত জগতের, যেখানে পুরুষেরাই একমাত্র উপার্জনক্ষম, পুরুষরাই দায়িত্ববান। পুরুষদেরকেই ঘরে–বাইরে ও বিশ্ব সংসারের হাজার কর্তব্য করতে হয়। এবং উলটোদিকে এই পুরুষদের জীবনে যুক্ত নারীরা ননীর পুতুল যাদের ক্ষমতা নেই নিজের ও অন্যের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার। সে দায়িত্ব তাদের উপর আরোপিত নয়। সে সংসারের বোঝা। বিয়ের আগে ভাইয়ের, বিয়ের পরে স্বামীর ও বৃদ্ধ বয়সে ছেলের উপরে ভরসা করেই তার জীবনযাপন। এখানে ধরে নেওয়া হল নারীর কর্ম–দায়িত্ব–ক্ষমতা সবই সীমাবদ্ধ। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংসারিক কোনো ক্ষেত্রেই তার কোনো ভূমিকা নেই। তার দেখভাল করার দায়িত্ব তার সঙ্গে যুক্ত পুরুষদের (এবং এই দেখভালের অজুহাতে শাসন ও শোষণ করারও)। সুতরাং এহেন এক নারীর হাতে এত অর্থ, বাড়ি, সম্পত্তি দিয়ে কী লাভ? আহা! সেগুলি তো সে নিয়ে পালাবে শ্বশুর বাড়ি! আচ্ছা, তার কি আদৌ কোনো বাড়ি আছে? কোন্‌ বাড়িটা তার বাড়ি? বাপের বাড়ি? ভাইয়ের বাড়ি? শ্বশুর বাড়ি? না স্বামী অথবা সন্তানের বাড়ি?

এখানে আর একটা কথা ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, বিয়ের সময় নারী দেনমোহর স্বরূপ অনেক অর্থ পায়, যেটা একান্ত ভুল। বিভিন্ন সমাজ এবং মূলত গ্রামাঞ্চলে নামমাত্র টাকা বা যৌতুকের বিনিময়ে নারীর দেনমোহর ধার্য করা হয়। তার কাবিলনামা বা নিকাহ্‌নামাতে তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো লিখিত আকারে দেওয়া হয় (উদাহরণ স্বরূপ তার স্বামী চাইলেই তাকে কখনও তিন তালাক দিতে পারবে না, অথবা নারীটি প্রয়োজন বোধ করলে ‘খুলা তালাক’ দিয়ে নিজেকে একটা অসুখী বিবাহবন্ধন থেকে মুক্ত করতে পারে)। তার দেনমহর ধার্য করতে দরকষাকষি ইত্যাদি সমগ্র প্রক্রিয়াটি চলে দু–পক্ষের পুরুষদের মধ্যে। আমরা নিজে দেখেছি, বিয়ে পড়ানো বা বিয়ে সম্পন্ন হওয়াকালীন এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নির্ধারিত হয় নারীর নামমাত্র উপস্থিতি বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে যেখানে একজন নারীরই ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সবটা সম্পন্ন হয় ভাই, চাচা, মামা, ফুফা, খালু, গাঁয়ের গণ্যমান্য ব্যক্তি, মোড়ল, মৌলবি সাহেব প্রমুখ পুরষের দ্বারা, যেখানে নারীর অভিপ্রায়, ইচ্ছা–অনিচ্ছা, বক্তব্য প্রায় নেই। তিন তালাক বিষয়ের সচেতনতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই সত্যটা উঠে এসেছে গ্রাম–গঞ্জের প্রান্তিক মুসলিম নারীদের মুখে যে, কাবিলনামার পরিধি, ক্ষমতা বা বাস্তবিক উপযোগিতা সম্পর্কে তাদেরকে কখনোই কিছু জানানো হয়নি। তারা জানতোই না বিয়ের সময় কোন্‌ বিষয়গুলিকে গুরুত্ব সহকারে কাবিলনামাতে লিখিয়ে নিলে বা ঠিক কতটা দেনমোহর ধার্য হলে তাদের পক্ষে ভালো হত।

এই নারীদের কাছ থেকে আমরা এও জানতে পারি যে, পরবর্তী কালে বিবাহিত জীবনে কোনো অশান্তি ঘটলে বা তারা মৌখিক তালাকপ্রাপ্ত হলে তাদের কীভাবে অর্থকষ্টে, লাঞ্ছনায় জীবন কাটাতে হয়েছে। বাপ–ভাইয়ের বাড়িতেও ঠাঁই হয়নি বা হলেও সে অস্তিত্ব কোনো সুখের নয়। আবার নিজস্ব কোনো অর্থ বা সম্পত্তি না-থাকায় সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে অনেকেই অপরিসীম যন্ত্রণা সহ্য করে শ্বশুরবাড়িতেই থেকে যায় শুধুমাত্র ভাত–কাপড়ে দিন গুজরানের জন্য।

অথচ দেখুন, এই নারীটির যদি নিজের অর্থ থাকতো তাহলে হতে পারতো যে, সে কোনো ব্যাবসা বা অর্থ উপার্জনের পথ পেত। মান–সম্মান–মর্যাদা সবই জুটতো। কিন্তু অর্থের অভাবে তা ঘটে না। এমতাবস্থায় সম্পত্তির সমবণ্টনের দাবি করলে তারা ‘লোভী’, ‘ঘর-ভাঙানি’, ‘খারাপ’ মেয়ে বলে সমাজ ও পরিবারে আখ্যায়িত হয়। ব্যাপারটা এমন, তুমি ভালো বোন কি না সেটা প্রমাণ দিতে হবে পৈতৃক সম্পত্তিতে তোমার কোনো দাবি না রেখে। এখানে নারীর সম্পত্তির সমান অধিকার তো দূরের কথা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাইয়ের অর্ধেকও পায় না বা চাওয়ার সাহস বা ‘আস্পর্ধা’ দেখাতে পারে না লোকলজ্জার ভয়ে। বলার অপেক্ষা রাখে না এই সম্পত্তিহীনা নারীটির শ্বশুর বা স্বামীর বাড়িতে তেমন কথার জোর বা দাম থাকে না। কারণ পুঁজিবাদী এই পৃথিবীতে যার ক্ষমতা বা অর্থ আছে তারই মর্যাদা আছে। এখানে আর একটি কথা বলে নেওয়া যাক। কিছুটা সম্পত্তি নারী যদিও-বা নিজের হাতে পায়, তা সত্ত্বেও সেই সম্পত্তিকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ বা খরচ করার স্বাধীনতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার থাকে না। এর কারণ কী? উত্তর হিসাবে আমরা একাধিক কথা বলতে পারি। যেমন ছোটোবেলা থেকেই নারীকে সম্পত্তি বা অর্থ নিজের হাতে না-দেওয়া, তাকে না-শেখানো যে, তুমিও তোমার ভাই বা দাদাদের মতো অর্থ বা সম্পত্তির অধিকারী এবং তোমারও সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে এই অর্থ বা সম্পত্তিকে নিজের বিবেক–বুদ্ধি অনুসারে কাজে লাগানোর, খরচ করার। তোমারও দায়িত্ব রয়েছে নিজেকে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার, যাতে তুমি নিজের ও পরিবারের বাকিদের দায়িত্ব নিতে পারো। পরিস্থিতি অনুসারে তোমারও যেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা গড়ে ওঠে। এটা যদি ছোটো থেকে একজন নারীকে অনুভব করানো হত তাহলে প্রথম থেকেই সে জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে নিজেকে আরও কুশল ও পটু সিদ্ধান্তকারী বা সিদ্ধান্ত নির্ধারক হিসাবে মেলে ধরতে পারতো। তার সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্ত ক্ষেত্রেই ব্যক্তিসত্তা ও মৌলিক চিন্তাশীলতা আরও বৃদ্ধি পেত। কিন্তু এই সমস্ত আশা–আকাঙ্ক্ষা আমরা আমাদের নারীদের প্রতি রাখি না। নইলে কি আজ অবধি পুরুষকে ‘কামাইওয়ালা’ আর নারীকে স্বামীর সংসারকর্ত্রী নামক বাঁধা গতানুগতিক জেন্ডার–রোলে বিভক্ত করে দিয়ে সম্পত্তির অনৈতিক ও অন্যায় বণ্টন ব্যবস্থাকে সঠিক বলে প্রতিপন্ন করার জোরদার চেষ্টা করি? সময় এসেছে যে পারিবারিক কাঠামোর অজুহাতে আমরা যেটা করি সেই ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করার এবং অনুধাবন করার যে, তার স্তরে স্তরে ঠিক কোন্‌ প্রকারের পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতি লুকিয়ে আছে, যুগের পর যুগ ধরে মুসলিম নারীরা যার শিকার হয়ে আসছে।

অনেকেই বলে থাকেন যে, শরিয়া মেনেও নাকি নারী–পুরুষের মধ্যে সম্পত্তির এই বণ্টনজনিত অসাম্য দূর করা সম্ভব। সেক্ষত্রে তারা মূলত উইল বা ওয়াশিয়ত বা হেবা বা দান করার উপায়কে পথ হিসাবে দেখান। অনেকে এও বলেন, ওয়াশিয়ত পন্থা অবলম্বন করার কথা স্বয়ং কোরান শরিফে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সামাজিক ন্যায়ের পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমরা দেখি, তাহলে আমরা কি কোনো দাদু, বাবার ইচ্ছা বা ভাইয়ের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করে বসে থাকতে পারি? ধরা যাক এই সদিচ্ছার বাস্তবায়ন সেই পুরুষটি যদি না করেন তাহলে? বর্তমানে তাই এই জটিল ও কঠিন সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়ার আশু সময় এসে গেছে। আমাদের সকলের কর্তব্য উত্তরাধিকার সংক্রান্ত শরিয়া আইনে মুসলিম নারীর অধিকার নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা।

 

ছবি : প্রতীকী

লেখক : অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক।

পুনঃপ্রকাশ। প্রথম প্রকাশ ১৪ মে, ২০২০

0 Comments

Post Comment