জরিনার অসন্তোষ সম্পত্তির হক্‌ নিয়ে

  • 25 April, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 573 view(s)
  • লিখেছেন : সিউ প্রতিবেদন
আমার বয়স পঞ্চান্ন বছর। বাকি জীবনটা লাথি-ঝাঁটা খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে? আমার মতো বহু মায়ের দায়িত্ব ছেলেরা এভাবেই পালন করে। আমার এই বিপদ থেকে বুঝতে পারছি প্রত্যেক মেয়ের নিজের উপার্জন দরকার। উপার্জন করার ক্ষমতা আমারও ছিল। সে ক্ষমতা স্বামীর গৃহে ব্যয় করেছি। ছেলে মানুষ করার  আন্তরিক তাড়নায় আর ব্যস্ত স্বামীর সংসার সামলানোর তাগিদে উপার্জনের ভাবনা বাদ দিয়েছিলাম। সেই স্বামী দিল ভাসিয়ে, ছেলে দিচ্ছে তাড়িয়ে।

জরিনার স্বামী ছ’মাস আগে একদিনের জ্বরে হঠাৎ মারা গেছেন। মেদিনীপুরের অবস্থাপন্ন ঘরের গৃহবধূ জরিনা। জীবিত অবস্থায় স্বামী যা আয় করেছেন, তা জমা-খরচের ব্যাপারে স্ত্রীকেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সন্তান নিয়ে যথাযথ গৃহকর্ত্রীর ভূমিকা  পালন করেছেন জরিনা। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু তাঁকে কঠোর বাস্তবের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মুসলিম মেয়ে তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর সম্পত্তির দু’আনার   শরিক। তাঁর বরাদ্দে স্বামীর সম্পত্তির ১/৮ অংশ। স্বামী বেঁচেথাকাকালীন বুঝতে পারেননি, কত শ্রম দিয়ে গড়ে তোলা সংসারের সামান্য একটু সম্পত্তির তিনি অংশীদার হবেন। ছেলে ঘন ঘন তাঁর অংশের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ছেলের আলাদা সংসার নয়, বিয়েও করেনি। তবু সম্পত্তি ভাগ করে নিজের তত্ত্বাবধানে নিতে চায়। মুসলিম পারিবারিক আইনমতো জরিনার প্রতিবাদ ধোপে টিকছে না।

জরিনা বললেন, ‘ছোট থেকে শুনেছি বাবা-মায়ের দায়িত্ব ছেলেদের বহন করতে হয়। ছেলেদের অংশে তাই বেশী সম্পত্তি থাকে। মেয়েদের সে দায়িত্ব নেই। স্বামীর বাড়ি চলে যায়। কিন্তু স্বামীর বাড়িতে মেয়েদের হক্‌ কতখানি সেটা তো অভিভাবকরা আগে জানাননি। এখন বুঝতে পারছি বাবার বাড়ি, স্বামীর বাড়ি হাত ফেরত হওয়াই মেয়েদের নসিব। আমার বয়স পঞ্চান্ন বছর। বাকি জীবনটা লাথি-ঝাঁটা খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে? আমার মতো বহু মায়ের দায়িত্ব ছেলেরা এভাবেই পালন করে। আমার এই বিপদ থেকে বুঝতে পারছি প্রত্যেক মেয়ের নিজের উপার্জন দরকার। উপার্জন করার ক্ষমতা আমারও ছিল। সে ক্ষমতা স্বামীর গৃহে ব্যয় করেছি। ছেলে মানুষ করার  আন্তরিক তাড়নায় আর ব্যস্ত স্বামীর সংসার সামলানোর তাগিদে উপার্জনের ভাবনা বাদ দিয়েছিলাম। সেই স্বামী দিল ভাসিয়ে, ছেলে দিচ্ছে তাড়িয়ে। মুসলিম সম্পত্তি  আইন এত নিখুঁতভাবে জানা  ছিল না। স্বামী মারা গেলে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবে আর স্ত্রী মারা গেলে স্বামী স্ত্রীর সম্পত্তির ১/৪ অংশ পাবে। এ কেমন বিচার? যেখানে অধিকাংশ মেয়ে উপার্জন করে না। তাঁদের প্রতি বঞ্চনার আইন তো মেনে নেওয়া যায় না। মাকে দেখা ছেলের দায়িত্ব, কর্তব্য বলে উপদেশ দিয়ে অনেকে দায় সারছেন। কিন্তু দায়িত্ব, কর্তব্য পালন না করলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে সে সমাধান কেউ দিচ্ছেন না। আমি মনে করি মৃত স্ত্রীর সম্পত্তিতে স্বামীর যতটা হক্‌, মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীরও ততটাই হক্‌ থাকার আইন হোক। আর সব মেয়েদের শপথ নেওয়া উচিত, উপার্জন করতে পারলে তবেই বিয়ে করবে। একবার সংসারের যাঁতাকলে জুড়ে দিলে বাইরের কাজে বেরোনো মেয়েদের পক্ষে খুব সমস্যার হয়।’

আইনের বৈষম্যকে জরিনা মানতে না পারলেও তাঁকে মানতে হচ্ছে। ধর্মীয় এই বিধান জরিনাকে করে তুলেছে মানসিক রুগী। আত্মীয়-বন্ধুরা বললেন, সারাদিন প্রচণ্ড  আক্রোশে তিনি ফুঁসছেন। কারণ ছেলে ক্ষণে ক্ষণে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তাঁর হকের গণ্ডি। জরিনার মতো আরও মেয়েদের যেন অসম্মান ও বঞ্চনার আইনে পড়ে মানসিক  রুগী হতে না হয় সেজন্যই লিঙ্গবৈষম্যের আইন সংস্কার করে নারী-পুরুষের সমান হক্‌ বর্তানো দরকার।

ছবি সংগৃহীত      

0 Comments

Post Comment