মুসলিম বহুবিবাহ আইনের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না?

  • 11 February, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 651 view(s)
  • লিখেছেন : আফরোজা খাতুন  
মুর্শিদাবাদের নাজনিনের (পরিবর্তিত নাম) ন’বছর আগে বিয়ে হয়েছে। এখন তাঁর সাত বছরের মেয়ে, দু’বছরের ছেলে। স্বামী কিছুদিন যাবৎ রাজ্যের বাইরে কাজ করছেন। বছরান্তে বাড়ি আসেন। করোনাকালীন লকডাউনের সময় স্বামী এসেও দিন তিনেক পরেই ফিরে যান। স্বামী চলে যাওয়ার সময় ভুল করে  ফেলে যান একটা মোবাইল। সেই মোবাইল ঘাটতে ঘাটতে নাজনিন খুঁজে পান স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্ধান।

মুর্শিদাবাদের নাজনিনের (পরিবর্তিত নাম) ন’বছর আগে বিয়ে হয়েছে। এখন তাঁর সাত বছরের মেয়ে, দু’বছরের ছেলে। স্বামী কিছুদিন যাবত রাজ্যের বাইরে কাজ করছেন। বছরান্তে বাড়ি আসেন। ঠিকমতো মাসের খরচ পাঠান না। গ্রামের বধূ  নাজনিন অর্থকষ্ট সামাল দিয়েছেন দাদাদের আশ্রয়ে থেকে। করোনাকালীন লকডাউনের সময় স্বামী এসেও দিন তিনেক পরেই ফিরে যান। স্বামী চলে যাওয়ার সময় ভুল করে  ফেলে যান একটা মোবাইল । সেই মোবাইল ঘাটতে ঘাটতে নাজনিন খুঁজে পান স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্ধান। সেই স্ত্রীকে নিয়েই তিনি মুম্বাইয়ে কাজের জায়গায় থাকেন।  শুরু হলো নাজনিনের নতুন অধ্যায়। ব্যাপারটা জানাজানি হলেও শ্বশুরবাড়ির লোক তেমন বিস্মিত হলেন না। এ আর এমন কী ঘটনা। মুসলমান ছেলের দুটো বউ তো জায়েজ (আইন সিদ্ধ)। আর একটা বিয়ে করলেও নাজনিনকে তাঁর স্বামী তালাক দেবে না বলে আশ্বাস দিলেন শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা। কিন্তু কেন দ্বিতীয় বিয়ে করতে হল তাঁর উত্তর কেউ দিতে পারেননি। নাজনিন সতীনের সঙ্গে থাকতে চান না। তাঁর দুই সন্তানের জন্য মাসের অর্থ বরাদ্দ করতে বললেন। কিন্তু স্বামীর কঠোর নির্দেশ, সতীনের সঙ্গে মিলেমিশে থাকলে তবেই বাচ্চাদের খরচ দেবেন।

নাজনিনের আত্মীয়রাও একটা মীমাংসার চেষ্টা করেন। নাজনিনের বাচ্চা দুটোকে কিছু সম্পত্তি লিখে দিতে অথবা মাসের খরচ বহন করতে। এসব প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়েছেন নাজনিনের স্বামী। পরিবর্তে দ্বিতীয় স্ত্রীকে বাড়ি নিয়ে এসে, নাজনিনের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছেন। দুটো বাচ্চার ভরণপোষণের কথা ভেবে নাজনিন মুখ বুজে সব সহ্য করতে করতে মানসিক রোগী হয়ে পড়েন। নাজনিনের মা তাদের নিয়ে যান নিজের কাছে। নাজনিনের স্বামী তারপর বাচ্চা দুটোরও খবর নেননি। মেয়েকে চিকিৎসা করিয়ে কিছুটা সুস্থ করার পর তাঁরা থানাতে অভিযোগ জানান। থানা  জানিয়েছে মুসলমানের আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। এ ব্যাপারে থানার কিছু করার নেই। গৃহবধূ নাজনিনের সামনে এখন সবই অন্ধকার। তাঁর অভিযোগ এই বহুবিবাহ আইনের বিরুদ্ধে। দুটো শিশুকেও পথে বসাতে পারে সেই আইনের উপর  ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘বহুবিবাহ আইনের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না?’ 

মুসলিম ধর্মে বহুবিবাহ জায়েজ (আইন সিদ্ধ) এই মিথ্যাকে সত্য বানিয়েছে মুসলিম পিতৃতন্ত্র। বহুবিবাহ অনুমোদন করলেও তার যে শর্ত আছে সেখানেই বহুবিবাহ আইন নাকচ হয়ে যায়। সব স্ত্রীর প্রতি সমান ব্যবহার করতে হবে এটাই ধর্মীয় নির্দেশ। তারপরেই বলা আছে, ‘আর তোমরা যতই ইচ্ছা কর-না কেন তোমাদের স্ত্রীদের সাথে কখনই সমান ব্যবহার করতে পারবে না, তবে তোমরা কোনো একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়ো না ও অপরকে ঝুলিয়ে রেখো না।’ (৪ সুরা নিসা) আইনের বক্তব্যের মধ্যেই বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয়েছে। ক্ষমতালোভী, স্বার্থান্ধ মুসলিম পুরুষ এটা ছেলেদের অধিকার মনে করে। ‘সেজন্যই বহু মুসলিম দেশে শক্ত আইন করে বহুবিবাহকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ওখানকার মওলানারা তো আর জেনেশুনে ইসলামের বিরুদ্ধে যাননি। যেমন সেনেগাল, মরক্কো, তিউনিসিয়া ইত্যাদি।’  (হাসান মাহমুদ : ইসলাম ও শারিয়া)। আমাদের দেশে ধর্মীয় আইন বিশারদগণের হাতে এমন কোনও ক্ষমতা নেই যা দিয়ে বহুবিবাহ করা পুরুষের বিচার করবেন। অর্থনৈতিক কারণে বহুবিবাহ কম একথা সত্যি কিন্তু বহুবিবাহ বন্ধ তো হয়নি।  বহুবিবাহ বন্ধের আইনের কথা উঠলেই অজ্ঞ, নির্বোধ মুসলিমরা হৈ হৈ করে ওঠে। আর এই নির্বোধ, মৌলবাদীদের চাটুকারিতে করেন এদেশের কতিপয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের পুরুষ। তখন তুলনামূলকভাবে হিন্দু পুরুষদের বহুবিবাহের কথা তোলেন। আইন না থাকা সত্বেও হিন্দু পুরুষরা নাকি মুসলিম পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি বহুবিবাহ করে। এই অন্যায়কারীরা আমাদের নিদর্শন হতে পারে না। যদিও অধিকাংশই তারা গোপনে বিয়ে করে। হিন্দু বহুবিবাহের প্রসঙ্গ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ে বহুবিবাহের সংখ্যা কম, এসব বক্তব্য অন্যায়-অপরাধ টিকিয়ে রাখার জন্য। সামাজিক সমস্যাকে আড়ালে রাখার প্রচেষ্টায়। অপরাধকে ধামা চাপা দেওয়ার প্রবৃত্তির মধ্যেও রয়েছে অন্যায়। আইন থাকলেও আইন অমান্যকারীর সংখ্যা সব স্তরেই রয়েছে। সেক্ষেত্রে আইন অমান্যকারীদের জন্য বিচার চাওয়ার দ্বারও খোলা। কিন্তু আইন না থাকলে কোথায় গিয়ে সুরাহা চাইবে? চুরি করা, খুন করা অপরাধ। তবু এগুলো হয়। এবং অল্প সংখ্যক মানুষ এই দুষ্কর্মে জড়িত। তাহলে কি আইনের কাছে এর প্রতিকার না চেয়ে, আইনটারই দরকার নেই বলব?

লেখক : অধ্যাপক ও সমাজকর্মী       

0 Comments

Post Comment