শাপিতপুরুষ (অষ্টম কিস্তি)

  • 16 January, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 396 view(s)
  • লিখেছেন : চন্দন আনোয়ার
পূর্বকথা- সকালের শান্ত স্নিগ্ধ বাতাসে রিমার শরীর সিক্ত হয়। ক্ষতগুলি কিছুটা শীতল হয়েছে। বাথরুমের লুকিং গ্লাসে নিজের মুখে নখের আঁচড় দেখে পাগলের মতো কাঁদে কিছুক্ষণ। ত্রস্ত হাতে এলোপাতাড়ি পানি ছিটায় ক্ষতগুলোতে। কী বিশ্রী একটা গন্ধ সারা শরীরে! রিমার মধ্যে ভিন্ন প্রশ্ন জাগে। উত্তেজক কোন ড্রাগ নেয় না তো সুমন? কোন সুস্থ মানুষ এতটা পাশবিক হতে পারে কী করে? তলপেটে ভেজা হাতের পরশ বোলায়। ভেতরের অন্ধকার ঘরে সুমনের যে সত্তা ক্রমেই জমাট বাঁধছে সে কি টের পেয়েছে বাবার এই হিংস্রতা? 

[১৪]

ঠাঁই নেই কোথাও : রিমা

রিমা যেখানে শিক্ষকতা করে সেটি মূলত উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির কমার্স কলেজ। সপ্তাহে দু’দিন, বড়জোর তিন যেতে হয়। শহরের ঠিক উত্তরের দিকে নতুন বাস স্টেশনের সাথেই কলেজ ক্যাম্পাস। রিকশায় যেতে-আসতে মোটের উপরে মিনিট চল্লিশেক লাগে। রিমা বরাবরই নিজের মতো একা থাকে, অফিসের এককোণে বসে পেপার পড়ে। সহকর্মীদের সাংসারিক গল্পে কান দেয় না। কলেজে যেন পড়াতে আসেনি, সাংসারিক গল্পগুজব করার জন্যে, বিশ্রাম নেবার জন্যে এসেছে। কার স্বামীর আয় বেশি, কার ছেলে বা মেয়ে কী করে, কোন স্কুলে চান্স পেয়েছে, কয়টা হাউজ টিউটর, কয়টা কোচিং, কে ফ্ল্যাট কিনেছে, কে প্লট কিনেছে, কে বাড়ি করছে, নিত্যদিনের বাজার, রান্নার রেসিপি, বিচিত্র ধরনের আঁচার তৈরির রেসিপি, সংসারের এহেন বিষয় নেই, এমনকি পুরুষ সহকর্মী পাশে না থাকলে গোপন-বিষয়াদি পর্যন্ত গল্পের বিষয় হয়। নিজের কৃতিত্ব জাহির করার পারদর্শিতার তুমুল প্রতিযোগিতা চলে। গণ্ডগোলও বাঁধে। দু-চারদিন কথা বন্ধ, তারপর ঠিক হয়। এসব কাণ্ডকীর্তি দেখে রিমা নীরবে হাসে। দুনিয়া কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, এরা কোন খবর-ই রাখে না।

আর কোন কাজ না থাকলে, ক্লাস শেষ করে রিমা সাধারণত দেরি করে না। মাসখানেক মোটেই দেরি করে না কলেজে। শরীর ভারি হয়ে উঠছে। চলে  ফেরে আস্তে-ধীরে। সুমনকে কথা দিয়েছে। ভেতরে আর একটা সুমনের হাত পা গজিয়েছে, নতুন সুমন নড়েচড়ে, টের পায়। তলপেট ভার ভার লাগে। সুমনের কড়া সন্দেহ এখনো। রিমার পাশে পাশে ফেউয়ের মতো  ঘোরেফেরে। নানান ছলছুঁতোয় ওখানে হাত ফেলে। ঘুমালে কাপড় তুলে আলতো করে হাতায়। কান রাখে পেটে। কিছু শোনার চেষ্টা কি না কে জানে? কাঁঠালের মতো পেট টেপে আঙুল দিয়ে। মাঝে মাঝে টোকা দেয়। সবই বোঝ রিমা। ভান করে পড়ে থাকে বিছানায়। কী উদ্গ্র বাসনা সুমনের! পিতৃত্বের কী ভয়ানক লোভ! প্রকাণ্ড একটা ভয়ের তাণ্ডব অস্থির করে তোলে রিমাকে। সন্তান পেয়ে আরও বদলাবে না তো সুমন? চৌদ্দ আনাই সুমন এখন আর আগের সুমন নেই। তখন দাঁড়াবে কোথায়? সহকর্মীরা কেমন টেরা টেরা কথা বলে। কলিজা মোচড় দিয়ে ওঠে, তবু মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। সহকর্মীদের মধ্যে ঠোঁট কাটা একজন হি হি করে হেসে বলেই ফেলল একদিন, রিমা ম্যাডাম তো হাইব্রিড বাচ্চার মা হচ্ছেন। প্রকাশ্যে চলে যেমন, নিরন্তর কানাঘুষাও চলে। রিমা টের পায়। ক্লাস থেকে ফিরছিল সেদিন, অফিসের দরজায় পা ফেলতেই কানে আসছে সহকর্মীদের ফিস্ফিসানি।

দেইখেন আগে-পরে সুইসাইড করব রিমা ম্যাডাম।

সুইসাইড করে যাবে কই? বেহেস্তে-স্বর্গে কোনখানে তো ঠাঁই নেই।

মরলেই বিপদটা ঘটবে! জানাজা তো হবে না। উনি তো এসব আবার বিশ্বাস করেন না।

মাটিতে পুঁতে রাখবে কেউ নিয়া? আর এ কাজ করবেই কে? বাপ নাকি ত্যাজ্য করছে।

কেন? পেটের বাচ্চা।

দূর! এই বাচ্চা কি মানুষ হবে? নিজেরা দিন-রাত পাপ করছে। আবার পাপের ফসলে পেট ভরেছে। তোর এসব করার কী দরকার বাবা? ফুর্তি-মোজ করে দিন কাটা। তারপর একদিন ফুট্টুস করে চলে যাবি। দুনিয়ার আনন্দের লাগিই তো এমন কাজ করলি!

আপনারা একমত কিনা জানি না। বাচ্চা নিয়ে কলেজে আসলে আমি কিন্তু সোজা মুখের উপর উনার মুখের উপরে বলে দেব, আমাদের বাচ্চাদের সাথে যেন না মিশে।

মাথা টাল খেয়ে ওঠে রিমার। দাঁত কামড়ে নিজেকে সামলে ঢুকে অফিসে। রিমাকে দেখে সবাই সামান্য চমকাল। কিছু যে শোনেনি, এ কথা প্রমাণ করতে আঁচল দিয়ে মুখ মুছে রিমা। বলে, ছেলেরা এত বাঁদর—যা তা প্রশ্ন করে। তারপর চুপসে গেল।

মানুষগুলোর ভেতরে আমাকে নিয়ে এত ভাবনা! হবেই না বা কেন? ওদের ধর্ম, ওদের সমাজের যে বড় ক্ষতি করে ফেলেছি। অন্ধ সমাজ তো অন্ধ মানুষকে জন্ম দেয়। মানুষের পৃথিবীতে মানুষই মূলত পরাধীন। রিমা তার স্বাধীনতা প্রয়োগ করেছে। ভালো কি মন্দ তার বিচার করতে যায়নি। এক ঝলক প্রশান্তির নিশ্বাস ফেলে রিমা।

[১৫]

অন্ধকার ধেয়ে আসছে, আলো কই : রিমা

বিকেল গড়িয়ে এখন প্রায় সন্ধ্যে। সন্ধ্যার গরম বাতাস সাঁই সাঁই করে ঢুকছে রুমে। একইসাথে ধেয়ে আসছে অন্ধকার। জড়োসড়ো বিছানা-বালিশের স্তূপের মধ্যে তীরবিদ্ধ পাখির মতো মুখগুঁজে পড়ে আছে রিমা। ওঠার তাগিদ অনুভব করছে না। এক এক করে নিঃশব্দে বেদনার ইট সিমেন্ট সুড়কি জড়ো হয়ে প্রকাণ্ড যন্ত্রণার একটি অট্টালিকা তৈরি হয়েছে রিমার কয়েক ইঞ্চি বুকে। বালিশ টেনে বুকে চেপে ধরে, খামছে ধরে আর একটি বালিশ। টগবগে রক্তের উন্মাদনা নিয়ে, ধর্ম, সমাজ সব ড্যামকেয়ার করে চুটিয়ে প্রেম করা যায়। অকাতরে নিঃসঙ্কোচে বছরের পর বছর এমনকি পুরো যৌবনটা কাটিয়ে দেওয়া যাবে দেহসুখ নিয়ে-দিয়ে। সমাজ-ধর্ম তখন শিকারি বিড়ালের মতোই ফাঁদ পেতে থাকে। কিন্তু বিয়ে—সে তো সমাজ স্বীকৃতি। রিমার বিয়ের স্বীকৃতি এ সমাজ কোনদিনই দেবে না। সহকর্মীরা তো রেখে ঢেকে বলে। এ শহরের যারা চেনে, তারাই রিমাকে দেখে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। ছাত্ররা পর্যন্ত কেমন কেমন চোখে তাকায়। বেয়াড়া এক ছেলে তো একদিন ক্লাসেই জিজ্ঞেস করেছে, ম্যাডাম, আপনার সন্তান কী হবে? হিন্দু না মুসলমান? রিমা অবশ্য খুব সহজ করে হেসে বলেছিল, কেন? মানুষ! মানুষ হবে। ও বড় হয়ে যা হতে চাইবে তাই হবে। উত্তরে যে ছেলেরা খুশি হতে পারেনি তা ওদের চোখের ভাষাই বলে দিচ্ছিল।

রিমা এখন পলে পলে নিজের ভেতরে ভাঙনের কলতান শুনতে পায়। এ জীবন তো জীবন নয়। মানুষ তো মানুষ, তাবৎ পৃথিবীটাই এখন ওদের প্রতিপক্ষ। একটা সেমিনারে আছে সুমন। ফিরতে সন্ধ্যা আরও ঘনাবে। রাতও হতে পারে। মুচড়ে পড়া শরীর টেনে হেঁচড়ে নিজেকে কোনমতে দাঁড় করায়। মুখে দু’আজলা পানি ছিটিয়ে এসে দাঁড়ায় বেলকনিতে। পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে বিশাল শূন্যতার দিকে।

মার্চ এপ্রিল জুড়ে বিশাল পদ্মা খাঁ খাঁ করে পানির অভাবে। নদীবিলাসীরা পাড়ে না দাঁড়িয়ে সোজা নেমে পড়ে। দাবড়িয়ে বেড়ায় নগ্ন পদ্মার বুকে। আয়েশ করে নিশ্বাস টানে। শুদ্ধ নিশ্বাস। ক্যাম্পাস জীবনে সুমনকে নিয়ে সপ্তাহে একদিন অন্তত আসত রিমা। সুমনের বন্ধু অয়ন মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল থেকে এসে যোগ দিত সাথে। বিশেষত, পদ্মার ভরা যৌবনের সময়টাতে সুমনের কী আনন্দ! ছটফট করত শুধু। হায় রে মন! জোরে নিশ্বাস ফেলে রিমা। পদ্মার এত কাছে দিন কাটে রাত যায় এখন। অথচ মন সায় দেয় না যেতে। ধবধবে সাদা দেয়ালে টাঙানো সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো দু’জনের ছবির দিকে তাকিয়ে রিমার চোখ ছলছল করে ওঠে। একটা মোহ একটা লোভ তাড়িয়ে বেড়াত তখন দিবানিশি। সুমনকে পাওয়ার লোভ। না পেলেই বোধ হয় বড় করে পাওয়া হত। অকস্মাৎ এক ঝাঁক বলাকা শাঁ শাঁ শব্দ করে উড়ে গেল রিমার সামনে দিয়ে। ওরা বাড়ি ফিরছে। রিমা ভাবে, এরাও তো একটা নিয়মের মধ্যে চলে। হোক তা মিথ্যা, হোক তা অযৌক্তিক, তবুও সুখ যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেখানেই আছে। কচুরিপানার মতো ভেসে কতদূর যাওয়া যাবে! ভেতর হতে ঠেলে আসে রিমার দীর্ঘশ্বাস।

মোবাইল বাজল। সুমনের কল। রিসিভ বাটন টিপতেই সুমনের ক্ষিপ্ত কর্কশ কণ্ঠ, অয়ন তুই নিজেকে কী ভাবিস? ঢাকায় থাকিস বলে, বড় ডাক্তার হয়েছিস বলে রামরাজত্ব পেয়েছিস নাকি? পয়সা কামাতে কামাতে তোর ভিতরে কোন মানুষ নেই! নইলে রিমার পেটের বাচ্চা খসাতে তোর এত তোড়জোর কেন রে? বুঝি না ভেবেছিস? শালা কুত্তার জাত! ধরম মরম নেই তোর। মাগিরে খুন কইরা তবে আমার শান্তি! তোকে সাফ বলে রাখি, বন্ধু বলে চারবার খাতির করেছি। এবার যদি আমার বউয়ের পেটের বাচ্চা বাইর করে ডাস্টবিনে ফেলিস, তোকেই করবো এক নম্বর আসামি। বাচ্চাকে তোর নিজের বলে চালিয়ে দিবি, অ্যা! তোর এত লোভ—শালা! দে না তোর ঢাউস বউটা আমার কাছে। দেখবি গণ্ডা গণ্ডা বাচ্চা বিয়ানোর ব্যবস্থা করে দেবো। বলে কুতকুত করে হেসে ওঠে সুমন। ভয়ে রিমার শরীর রামঝাঁকুনি দিয়ে উঠলে স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বিছানায় ধপাস করে বসে যায়। হাত আলগা হয়ে খসে পড়ে মোবাইল। মৃত্যু আতঙ্কে রিমার মুখ রক্তশূন্য হয়ে সাদা ধোঁয়ার মতো ফ্যাকাশে হয়ে আসছে।

মোবাইল বেজে ওঠে ফের। ভয়ে ভয়ে কানে নিল রিমা। সরি দোস্ত, অয়নের নম্বরে কল করতে গিয়ে ভুল করে তোমার নম্বরে...। আদরের মুহূর্তে রিমাকে দোস্ত বলেই সম্বোধন করে সুমন। নিজেকে সামলে নিয়ে বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠে এবং কিছুটা স্মিত হাসি দিয়েই বলে রিমা, তোমার মাথার ঘিলু একেবারে ফিনিস! ছি! বন্ধুকে কেউ এভাবে...। যাই হোক, কখন শেষ হবে তোমার সেমিনার?

ইদানিং অয়নের সাথে ফোনে আমার এমন খুনসুটি হয়। ও আবার তোমার পক্ষের উকিল কিনা। সুমন হাসে।

হুঁ শব্দ করে লাইন কেটে দিল রিমা। খোলা জানালা দিয়ে একটু একটু করে সন্ধ্যার অন্ধকার ঢুকে পড়ছে রুমে। অন্ধকার কাঁপিয়ে প্রায় বিলাপ করে মিনিট পাঁচেক কাঁদল রিমা। বাতি জ্বালাবার তাগিদ অনুভব করে না। যে জীবনে অনন্ত অন্ধকারের হাতছানি, তার এ আলোতে কী হবে! অন্ধকারেই মুখ লুকিয়ে পড়ে থাকল।   

[চলবে...]

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অধ্যাপক (নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ) 

0 Comments

Post Comment