সাহিত্যে নারীত্বের নির্মাণ (পর্ব-৪) 

  • 05 September, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 93 view(s)
  • লিখেছেন : তামান্না
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নানান ধরনের  নারী চরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে। ‘পদ্মানদীর মাঝি'-র কপিলা, 'পুতুল নাচের ইতিকথা'র কুসুম সাহসী ও স্বতন্ত্র। এই চরিত্রগুলি সৃষ্টি করতে গিয়ে উল্লেখ্য দুটি উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নানান দ্বিধাদ্বন্দ্ব, নানা জটিলতাকে উপস্থাপন করেছেন। আমরা একটু আগে বলেছি-, 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসের কপিলা, 'পুতুলনাচের ইতিকথা' উপন্যাসের কুসুম প্রথাগত নারী-আইডিয়ার মোড়কে বন্দি নন, তাঁরা সমাজ ও শাস্ত্রের  নারী-আইডিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অধিষ্ঠিত। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ও গল্পের নারী  চরিত্রগুলি সমসাময়িক সাহিত্যিকদের  নারী চরিত্রদের থেকে অনেকাংশে স্বতন্ত্র ছিল। আমরা যদি মনযোগ দিয়ে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তাহলে খুব সহজে আমাদের কাছে আলোচনাটি পরিষ্কার  হয়ে উঠবে। আমরা এতক্ষণ যে আলোচনা করলাম সেখানে বেশিরভাগ নারী চরিত্র গতে বাঁধা, মহীয়সী, মমতাময়ী, ত্যাগী। শত কষ্টের মধ্যেও তাঁরা ত্যাগ স্বীকার করে একটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। মানিকের নারী  চরিত্ররা কিন্তু মিনমিন করে, লোকলজ্জার ভয়ে গুটিয়ে থাকেননি। সংস্কার, সামাজিকতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। নিজের মন-শরীরের শুচিতা নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা নেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত দুটি উপন্যাসে পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬) পুতুল  নাচের ইতিকথায় (১৯৩৬) নারীর ছকভাঙা-রূপ আমরা দেখেছি।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নানান ধরনের  নারী চরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে। ‘পদ্মানদীর মাঝি‘-র কপিলা, 'পুতুল নাচের ইতিকথা'-র কুসুম সাহসী ও স্বতন্ত্র। এই চরিত্রগুলি সৃষ্টি করতে গিয়ে উল্লেখ্য দুটি উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নানান দ্বিধাদ্বন্দ্ব, নানা জটিলতাকে উপস্থাপন করেছেন। আমরা একটু আগে বলেছি—, 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসের কপিলা, 'পুতুলনাচের ইতিকথা' উপন্যাসের কুসুম প্রথাগত নারী-আইডিয়ার মোড়কে বন্দি নন, তাঁরা সমাজ ও শাস্ত্রের নারী-আইডিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অধিষ্ঠিত। 

এখানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস প্রসঙ্গে দু- একটি কথা বলা প্রয়োজন। 'দিবারাত্রির কাব্য’ (১৯৩৫) উপন্যাসের প্রথম প্রকাশের ভূমিকায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন— 'দিবারাত্রির কাব্য’ আমার একুশ বছর বয়সের রচনা। শুধু প্রেমকে ভিত্তি করে বই লেখার সাহস ওই বয়সেই থাকে। কয়েক বছর তাকে তোলা ছিল। অনেক পরিবর্তন করে গত বছর (১৩৪১ বঙ্গাব্দ) বঙ্গশ্রীতে প্রকাশ করি। দিবারাত্রির কাব্য পড়তে বসে যদি কখনো মনে হয় বইখানা খাপছাড়া, অস্বাভাবিক,— তখন মনে রাখতে হবে এটি গল্পও নয়, উপন্যাসও নয়, রূপক কাহিনী। রূপকের এ একটা নূতন রূপ। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতগুলি অনুভূতি দাঁড়ায় সেইগুলি মানুষের নয়, মানুষের Projection— মানুষের এক টুকরো মানসিক অংশ।’

এই উপন্যাসে যে সকল নারীর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছে, তাঁরা সমসাময়িক অন্য সাহিত্যিকদের চরিত্র থেকে আলাদা, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই, তবে উপন্যাসের মূল চরিত্র হেরম্বের কাছে দুই নারী চরিত্রই হেরে গেছেন। সুপ্রিয়া হেরম্বকে ভালবাসত। কিন্তু হেরম্ব সুপ্রিয়ার অন্য জায়গায় বিয়ে দেন। পরে যখন সুপ্রিয়া হেরম্বের কাছে ফিরতে চান, হেরম্ব তখন সুপ্রিয়াকে পরস্ত্রী বলে গ্রহণ করেননি। আবার, হেরম্বের অপর প্রেমিকা আনন্দ, তাঁকে নিয়েও সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দুঃখে, কষ্টে, যন্ত্রণায় আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আনন্দ। এখানেই আনন্দের পরাজয় ঘটেছে। এতকিছুর পরেও উপন্যাসের নায়ক হেরম্ব। এই মৃত্যুর জন্য আমরা কি হেরম্বকে দায়ী করেছি? 

‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের কপিলাকে আমরা সম্পূর্ণ অন্যরূপে আবিষ্কার করেছি। উপন্যাসের সূচনায় জেলেদের জীবন কাহিনি প্রাধান্য পেয়েছে, কিন্তু যখন থেকে কপিলার আবির্ভাব হয়েছে উপন্যাসে, তখন থেকে এই উপন্যাস কপিলাময় হয়ে উঠেছে। কেতুপুরে কপিলা আসার পর থেকেই, কুবেরের জীবনে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। মানিকবাবু কপিলাকে একটু রহস্যময়ী হিসেবে গড়তে চেয়েছিলেন। শাশ্বত সংসারী গ্রামের বধূ নন কপিলা, তিনি স্বামী- সংসারহীন, স্বাধীনচেতা একজন নারী। লিবিডো-বাসনার সুতীব্র টান কপিলা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাসে কপিলা কখনো স্বামী, মৃত সন্তানকে নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেননি। বরং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের দেখিয়েছেন, কপিলার বয়স কম, তাঁর জীবনে শখ আহ্লাদ আছে। “খাওয়া-দাওয়ার পর কপিলা ও তাহার ভাইবোনেদের সঙ্গে করিয়া কুবের কেতুপুরের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া পড়িল। কপিলা খুব সাজিয়াছে। চুলে চপচপে করিয়া দিয়াছে নারিকেল তেল, হলুদ মাখিয়া করিয়াছে স্নান, পরিয়াছে তার বেগুনে রঙের শাড়িখানা। স্বামী ত্যাগ করিয়াছে বটে, বয়েস তো তার কাঁচা। আহা, কুটুমবাড়ি যাওয়ার নামে মেয়েটা আহ্লাদে আটখানা হইয়া উঠিয়াছে।” (তথ্যসূত্র- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০০৬, পদ্মানদীর মাঝি, কলকাতাঃ বেঙ্গল পালিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, পৃষ্ঠা-৪৩)  

আবার, কেতুপুর গ্রামে সহসা এক সন্ধ্যায় পূজার উৎসবের দিন কপিলার দুর্ভেদ্য মনোজগতের সঙ্গে পাঠক পরিচিত হন— “বলিতে বলিতে আর কপিলা আঁচল টানাটানি করে না, কুবের তাহাকে জড়াইয়া ধরিলে শান্ত হইয়া থাকে, হঠাৎ বড় যেন করুণ কণ্ঠে বলে, মনডা ভাল না মাঝি, ছাড়বা না? মনডা কাতর বড়ো।
কুবের তাকে ছাড়িয়া দেয়।
চলিতে চলিতে জিজ্ঞাসা করে, মন কাতর ক্যান রে কপিলা?
কে জানিত কপিলা এমন উত্তর দিবে!
সোয়ামিরে মনে পড়ে মাঝি।” (তথ্যসূত্র- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০০৬, পদ্মানদীর মাঝি, কলকাতাঃ বেঙ্গল পালিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, পৃষ্ঠা-৫৪ ) 

ফ্রয়েডীয় দেহকামনার জটিলতা উপন্যাসে একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে। কপিলার ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব উপন্যাসে বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর সাহসিকতা দেখে ছাপোষা, গোবেচারা কুবেরও অনেকখানি সাহসী হয়ে উঠেছেন! ব্যক্তিত্বময়ী কপিলার চরিত্রে ভয়-ভীতি খুব একটা  প্রকাশ পায়নি। গোপীর চিকিৎসার জন্য তাঁরা আমিনবাড়ীতে যান। সেখানে কুবেরের সঙ্গে কপিলা নির্দ্বিধায় হোটেলে রাত কাটান।  লোকে কী বলবে সে ভাবনায় তাঁকে বিচলিত হতে দেখা যায় না। আবার তাঁর স্বামী শ্যামাদাস তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁকে গ্রহণ করতে চাইলে কপিলা আনন্দের সহিত কুবেরকে পাত্তা না দিয়ে, শ্যামাদাসের কাছে ফিরে যান!

লেখক : প্রাবন্ধিক, সমাজকর্মী

ছবি : সংগৃহীত

0 Comments

Post Comment