আমার দিনগুলো

  • 11 September, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 104 view(s)
  • লিখেছেন : খালিদা খানুম
মানুষের ডাক্তার আমি নয়। কিন্তু মানুষের অসুখগুলো বুঝতে পারি। মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসুখের বীজ। আমার হাসপাতালে যে এসেছে, ছাগল ছানাটিকে দেখতে গিয়ে আমি সন্ধ্যামনি মান্ডির অসুস্থতার খবর আঁচ করি। তার চিরুনী না পড়া উস্কোখুস্কো চুল, আগোছালো শাড়ি, অসুস্থ বাচ্চা আমাকে বলে দেয় সন্ধ্যামনি মান্ডি অসুস্থ, যে অসুখ কেবল শরীরে নয়। আর এই অসুখের চিকিৎসা করতে আমি অপারগ।

একটি নতুন নেশা হয়েছে, বনফুল দেখার নেশা। কী বনফুল দেখলাম তা বলতে পারব না, কারণ সব বনফুলের নাম জানি না। হয়তো তাদের নাম নেই। কেউ হয়তো নিজের মতো করে একটি নাম ধরে ডেকেছে কিন্তু সে বড় ঘরোয়া নাম, ডাকনাম বলা যায়। সে নাম কোনো কাগজে নথিবদ্ধ হয়নি। নিজেদের প্রয়োজনে মানুষ তাদের একটা নাম দিয়েছে। নাম থাকুক বা নাই থাকুক তাতে তাদের কিছু যায় আসে না, তারা ঝোপজঙ্গল আলো করে থাকে। বনফুল দেখতে দেখতে অনেকটা সময় চলে যায়, শিম্বগোত্রের গুল্ম, কাঁটাওয়ালা পাতা কত রকমের গাছ। হলুদ বেগুনী সাদা রঙের বাহার। এদেরকে দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, গোলাপের এই জগৎজোড়া খ্যাতি যদি না হত, যদি প্রেম ভালোবাসায় গোলাপ কদর না পেত, তাহলে কী গোলাপ বনফুল হিসাবে এদের সাথেই ফুটতো না? কে জানে একদিন হয়তো গোলাপ এদের সাথেই ফুটতো জঙ্গল আলো করে।

কী জানি!

জগতের কতকিছুই তো আমরা জানি না।

যেমন পুরুলিয়ার অন্যতম পরব করম পরব সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা নেই। আমিও এখানে চাকরিসূত্রে না এলে জানতে পারতাম না। এটা কোনো পুজো-আচ্চার ব্যপার না, এটা অনেকটা ব্রত মতো। এটা পুরোপুরি মহিলাদের ব্যাপার। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময়টুকু আমার একটা নিজস্ব জগৎ, যেখানে কেবল আমি আর আমার পাশে আকাশ মাঠ বনফুল। সেদিন ফেরার সময় দেখলাম কিছু মেয়ে মহিলা রাস্তায় একটা ডাল ফেলে গাড়ি থামিয়ে টাকা তুলছে। জোরাজুরি কিছু না। আমার ব্যাপারটি বেশ মজা লাগলো, এতোদিন ছেলে ছোকরাদের দেখেছি গাড়ি থামিয়ে টাকা তুলতে, এই প্রথম দেখলাম প্রমীলাবাহিনী। একটা করম পরবের জাওয়া ডালি রাস্তায় রাখা আছে। করমপরবের জন্য টাকার খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। এটা পুরোপুরি পারিবারিক আচার। একটা ডালিতে বিভিন্ন শষ্যবীজ রাখা হয় অঙ্কুরদগমের জন্য। এই জাওয়া ডালা বা টুপাটিকে ঘিরে চলে রাত জাগরণ, গান নাচ। গান নাচ আমাদের চটুল হিন্দি বা বাংলা নাচ নয়, জাওয়া গীত বলে একটি বিশেষ গান গাওয়া হয় তাতে। এই জাওয়া গানের রচয়িতা বিশেষ কেউ নয়, মেয়েদের মুখে মুখে এই গান প্রবাহিত হয়ে আসছে অনেকদিন ধরে। সংসারের হাসিকান্না সুখদুঃখ নিজেদের কথা তাই ঘিরেই গান। মেয়েরা একে অপরের হাতে হাত বেঁধে জাওয়া ডালাটিকে ঘিরে নাচ করে। এই নাচের মাধ্যমে এটাই যেন প্রকাশ হয়, সুখ দুঃখ যায় আসুক, আমরা জোটবদ্ধ থাকবো।

কোনো কোনো স্থানে এই করম পরব ঘিরে মেলা হয়, তবে আমাদের সাঁতুড়িতে হয় না।

আমি যদিও জানতাম এটা করম পরবের ডালা, তবু মেয়েগুলোকে জিজ্ঞেস করলাম, কী পরব?

— আকুড়ি পরব।

— নেমতন্ন করবে না? আমার কথায় সবাই হেসে উঠলো। বলল, কেনে করব্য না। রাত জাগা হবে আজ। সন্ধ্যাবেলায় চল্যা আসো।

আমি বললাম, সন্ধ্যা বেলায় কী আসতে পারব?

একজন বলল, তাহলে এখন নাচ দেখবা, গান শুনবা? নাচবো?

ওই অবস্থায় তাদের নাচ দেখাতে চাওয়াটা আমার কোথায় গিয়ে যেন বিঁধলো। আমি বললাম, না এখন নাচতে হবে না। এখন তাড়া আছে।

আমার কোনো তাড়া ছিল না। আমি কেবল তাদের খুশিটুকু ফ্রেমবন্দী করি।

সন্ধ্যামুনি মান্ডি, মানজুরি। এই নামটি বলেছিল মেয়েটি আমার হাসপাতালের খাতায় নাম এন্ট্রি করানোর জন্য। কোলে একটা ছাগলের বাচ্চা, সাথে বছর পাঁচেকের বাচ্চা। মেয়েটির বয়স হয়তো কুড়ি কী বাইশ। অগোছালো শাড়ি, আঁচল খুলে যাচ্ছে এদিকওদিক। বাড়ি থেকে আসার আগে মনে হয় মাথায় চিরুনী করেনি, চুল উস্কোখুস্কো। আমি সাধারণত এখানের মেয়েদের পরিপাটিভাবে থাকতে দেখেছি। একে দেখে তাই চোখে লাগল। ছেলেটিকে দেখেও অসুস্থ মনে হল। গলায় জন্ডিসের মালা, চোখমুখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে জ্বর আছে।

মেয়েটি কোল থেকে ছাগল বাচ্চাটি নামিয়ে বলল, দ্যাখোতো কাল থেকে ভ্যালছে।

ছাগল বাচ্চাটি উঠতে পারছে না। পেটে কৃমি আছে। দুর্বল।

আমি ছাগল বাচ্চাটির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে মেয়েটিকে বললাম, তোমার ছেলের তো জ্বর মনে হচ্ছে, ওকে এনেছো কেন? হাসপাতালে নিয়ে যাও।

আমাদের পশু হসপিটালের কিছু দূরে একটা মানুষের চিকিৎসার সেন্টার আছে। ডাক্তার নেই। নার্স আছে। ডাক্তার এখন দু চার দিন নেই এমন নয়, অনেকদিন ধরেই নেই। এলাকার মানুষের কথানুসারে বছর দশেক। বছর দশেক আগে একবার হাসপাতালের ডাক্তারের সাথে এলাকার মানুষের ঝামেলা হয়েছিল। হাসপাতাল ঘেরাও হয়েছিল। তখন থেকে ডাক্তার নেই। মুরাডি ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আছে।

আমাকে মেয়েটি বলল, দেখো না বাজারে আসছি শুনে পিছন ছাড়ল্য না। বলে দুকানের জিনিস খাবে। কদিন আগে জন্ডিসের মালা পরালাম, তাও শরীর ঠিক হচ্ছে না। আমি বলনু এতো রোদে যাস না। মাথায় রোদ লেগে যাবে। সাথে আবার ছাগল ছা খান আছে। কাঁদতে শুরু করল। কী কাঁদন! পিছনে পিছনে চলে এল।

মানজুরি গ্রামটি সাঁতুড়ি বাজার থেকে অনেকটাই দূর। একঝুড়ি মাটি উপুড় করে দিলে যেমন আকার নেয়, তেমন আকারের একটি টিলার পাসদেশ ঘেঁসে মানজুড়ি গ্রামে যেতে হয়। রাস্তাটি বড় সুন্দর। আসার সময় ঢালুর রাস্তায় এসেছে, কষ্ট হয়নি বেশি, কিন্তু ফেরার সময় উঁচুর দিকে উঠতে হবে।

আমি বললাম, বাড়ির কাউকে দিয়ে ছাগল-ছাটাকে পাঠাতে পারতে।

মেয়েটি মুখ নীচু করে থাকল।

আমি বললাম, এনেছ যখন ছেলেটাকে দেখিয়ে নাও। জন্ডিস মালার ভরসায় রেখো না। জ্বর আছে।

— তুমি একটু দেখে দাও না কত জ্বর! মানুষের হাসপাতালে ডাক্তার নাই।

মানুষের ডাক্তার আমি নয়। কিন্তু মানুষের অসুখগুলো বুঝতে পারি। মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসুখের বীজ। আমার হাসপাতালে যে এসেছে, ছাগল ছানাটিকে দেখতে গিয়ে আমি সন্ধ্যামনি মান্ডির অসুস্থতার খবর আঁচ করি। তার চিরুনী না পড়া উস্কোখুস্কো চুল, আগোছালো শাড়ি, অসুস্থ বাচ্চা আমাকে বলে দেয় সন্ধ্যামনি মান্ডি অসুস্থ, যে অসুখ কেবল শরীরে নয়। আর এই অসুখের চিকিৎসা করতে আমি অপারগ।

লেখক : পশুচিকিৎসক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্পকার

ছবি : সংগৃহীত

0 Comments

Post Comment