মুক্ত ডানার কপোত

  • 29 March, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 345 view(s)
  • লিখেছেন : মীরা কাজী
হঠাৎ দমকা বাতাসে আমার মাথা থেকে হিজাবটি উড়ে গিয়ে  রাস্তার ধারে কাঁটা ঝোপের মধ্যে গিয়ে পড়ল।তাড়াহুড়ো করে সেটিকে ঠিক করে বাঁধা হয়নি। আমাকে সরিয়ে দিয়ে মা সেটিকে  উদ্ধার করে তার একটা কোণা মুঠোয় ধরে বাতাসে মেলে দিল। সাদা কাপড়ের টুকরোটি বাতাসে দোল খেতে খেতে মাঠের ওপর দিয়ে পত পত করে উড়ে যেতে লাগল। ঠিক যেন একটা সাদা কপোত আকাশের গায়ে ডানা মেলে দিয়েছে। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম সেদিকে।

ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। সবাই ট্রেনে উঠে যে যার সিটে বসার উদ্যোগ করছে। আমারও এবার ট্রেনে উঠে পড়া উচিৎ। কিন্তু উঠতে পারছি না। যার জন্য এখানে আসা সেই তো এখনও এসে পৌঁছাল না। হতেও পারে মেয়েটি তার সিধান্ত বদল করেছে। কিন্তু  আমাকে একটা ফোন করে জানাবে না? ওই তো! একটা মেয়ে উদভ্রান্তের মত এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে এদিকেই আসছে! নিশ্চয় ওই হবে। মেয়েটির সাথে আমার চাক্ষুষ পরিচয় হয়নি। কথাবার্তা যা কিছু হয়েছে সবটাই মোবাইলে। ডাকব কি ডাকব না ভাবছি, মেয়েটি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম  করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বড়বড় দুটো ব্যাগ টেনে আনতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। এবার মেয়েটিকে চিনে নিতে আমার অসুবিধে হল না। চোখ-মুখ, চাহনি,দাঁড়ানোর ঋজু ভঙ্গিমা অবিকল তার মায়ের মত।

তুমি বীথি?

হাঁ। আপনি নিশ্চয় অনেকক্ষণ- - -?

আমাকে তুমি করে বলবে। আগে ট্রেনে ওঠ। পরে কথা হবে।

 

ট্রেনে উঠে বীথি একটা কথাও বলছেনা। উদাস ভঙ্গিতে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। যদিও সে কিছুই দেখছে না। তার মনে অন্য ভাবনা কাজ করছে।ব্যাগ খুলে একটা টিফিন কৌটো বার করে বললাম, "এতে কিছু খাবার আছে খেয়ে নাও"। বীথি কৌটোটি নিয়ে সিটের পাশে নামিয়ে রাখল। তার চোখ ভেজা।

 

বুঝতে পারছি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তুমি যদি ফিরে যেতে চাও আমি নিজে তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসব। সস্নেহে  বীথির পিঠে হাত রাখলাম।

 

না মাসিমনি! আমি ফেরার কথা ভাবছি না। আমি মন স্থির করে ফেলেছি। শুধু মায়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে।

আমি নাসিমাকে যতটুকু চিনি তাতে ও নিজেকে ঠিক সামলে নেবে। এখন খেয়ে নাও।

কৌটো খুলে খাবার শেষ করল বীথি। এখন ওকে অনেকটা ধাতস্থ মনে হচ্ছে। আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমোবার চেষ্টা করতে লাগলাম। অনেকটা জার্নি হয়েছে। বেশ টায়ার্ড লাগছে।

মাসিমনি?

কিছু বলবে? আমি চোখ বন্ধ অবস্থাতেই বললাম।

তুমি হয়তো ভাবছ, কি এমন ঘটনা ঘটল, যার জন্য আমাকে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হল?

না। আমি ওসব কথা মোটেই ভাবছি না। তাছাড়া তুমিতো ফোনে আমাকে বলেছ।

 

সবটুকু বলিনি। এখন থেকে আমি তোমার আশ্রয়ে থাকতে চলেছি। সবটুকু তোমার জানা দরকার। আবারও চোখ মোছে বীথি।

এভাবে ভাবছ কেন? একসময় আমি তোমার মায়ের খুব প্রিয় বন্ধু ছিলাম। যদিও যোগাযোগটা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে গেছে। তবুও তুমি আমার মেয়ের মত। একটা সমস্যায় পড়ে আমার সাহায্য চেয়েছ। আমি সাহায্য করতে রাজি হয়েছি। এর বেশি কিছু নয়। এর মধ্যে আশ্রয় দেওয়া, নেওয়ার প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে? তাছাড়া আমার সাথে তোমার কথা হয়েছে, নিজের ভার, তোমাকে নিজেকেই নিতে হবে। আমি তোমাকে এব্যাপারে কিছুটা সাহায্য করব।

 

তুমি অন্য অনেকের থেকে আলাদা বলে একথা বলছ। আমিতো জানি তুমি রাজি না হলে আমার কি হত?

থাক এখন ও সমস্ত কথা। তোমার উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। এখন একটু ঘুমোবার চেষ্টা কর।

তোমাকে সবটুকু না বললে আমি যে শান্তি পাচ্ছিনা।

 

ঠিক আছে। তাহলে বল। আমি চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলাম। বীথি বলতে শুরু করল। ঠিক স্মৃতিচারণের মত করে।

 

ছোটবেলায় আমি বাবার খুব ন্যাওটা ছিলাম। বাবা বাড়িতে থাকলে মায়ের কাছে ঘেঁষতাম না। মা ছদ্ম অভিমানে বলত, "তুইতো তোর বাবার মেয়ে। আমার কেউ নোস। " বরাবর আমি ভাল রেজাল্ট করি। আমাকে নিয়ে বাবার খুব গর্ব। বাবা বিজ্ঞানের শিক্ষক। আমিও স্বপ্ন দেখি বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা করে বাবার মুখ উজ্জ্বল করব।

 

আমার তখন ক্লাস নাইন। এমন সময় একদল মানুষ আমাদের গ্রামে এসে হাজির হল। তারা বলতে লাগল- দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। চিরস্থায়ী সুখের জন্য দ্বীনের কাজ করাই উচিৎ। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনাচরণের সাথে ধর্মকে সামিল করে নিতে হবে। তাহলে বেহেস্তের অনন্ত সুখ তার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে।দোজখের আগুন তার জন্য হারাম হয়ে যাবে। কথাগুলো নতুন কিছু নয়। কিন্তু তাদের বলার ধরনের মধ্যে এমন কিছু ছিল,বার বার শোনা কথাগুলো মোহিত হয়ে সবাই শুনতে লাগল।

কয়েকদিন পর তারা চলে গেল। কিন্ত কিছু মানুষের মনে তার প্রভাব থেকেই গেল। আমার বাবার মত মানুষ, যে কোনোদিন নামাজরোজার ধার ধারত না।মসজিদের জমায়েতে যেতেই রাজি হচ্ছিল না। অনেকের জোরাজুরিতে শেষপর্যন্ত গিয়েছিল। সেও আমাদেরকে অবাক করে ধীরেধীরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে অভ্যস্থ হয়ে উঠল। অন্যসব কিছুই আগের মতই করে। স্কুলে যায়, আমাকে পড়া বুঝিয়ে দেয় তবুও কেন জানি মনে হয় সেই বাবাকে আমি আর পাচ্ছি না।

একদিন বাবা মাকে বলল, "বীথি যেন বিকালে বাড়িতে থাকে। তাকে কোরান পড়াতে একজন মৌলবী আসবেন"।

 

ওর তো বিকালে টিউশন আছে। মা বলল।

 

একটা টিউশন বাদ পড়লে কি এমন হবে? আজবাদ কাল ওর বিয়ে দিতে হবে।তার আগে নামাজ কোরান রপ্ত করতে হবে।

মাধ্যমিক পরীক্ষার পর অনেকটা সময় পাবে। তখন না হয়- -!

 

না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরো আগে এদিকটা আমার ভাবা উচিৎ ছিল। মাকে আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বাবা বেরিয়ে গেল।

বাবার কথা শুনে আমার মাথায় চিন্তার পাহাড়। সামনেপরীক্ষা। এসময় টিউশন বন্ধ করতে হবে? বাবাকে যে বুঝিয়ে বলব তারও উপায় নেই। একসাথে খাওয়া, ওঠা, বসা সবই আছে। তবুও কিভাবে যেন বীথির সঙ্গে তার যোজন মাইল দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। এখন তার কোলে মাথা রাখা যাচ্ছে না।যখন যা খুশি আবদার করা যাচ্ছে না। বাবাও আর তার চুলে বিলি কেটে দেয় না। "আমার মা কই? " বলে ডাকে না। তবুও গেলাম। একছুটে লাফ ঝাঁপ করে নয়। পায়েপায়ে গিয়ে বললাম, "বিকালে অঙ্কের টিউশন বন্ধ করলে আমার অসুবিধে হবে!”

 

ওই অসুবিধেটুকু তোমাকে মানিয়ে নিতে হবে। তোমার বয়সি মুসলমান ঘরের কোন মেয়েটা নামাজকোরান জানে না খুঁজে দেখাওতো? বাবা ধমকে উঠল।

 

কান্না চেপে আমি বাবার সামনে থেকে সরে এলাম। কবে বাবা আমাকে ধমক দিয়ে কথা বলেছে মনে পড়ে না। বেশি কষ্ট হল আমাকে তার তুমি করে বলায়। সেই ছোট্টটি থেকে বাবাই আমার আদর্শ। যা মায়ের কাছে বলিনি তাও বাবার কাছে অকপটে বলেছি। আমার সেই বাবা আমাকে পর করে দিচ্ছে। এ আমি কেমন করে সইব? কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম।

এতসবের মধ্যেও নাইন থেকে টেনে ওঠার রেজাল্ট ভালই হল। আমার রেজাল্ট দেখে বাবার চোখে মুখে আগের মত আলো খেলল না।পরবর্তীতে আরো ভাল রেজাল্ট করার জন্য উৎসাহিত করল না। বাবার ঔদাসীন্য আমার জিদ বাড়িয়ে দিল- ভাল রেজাল্ট আমাকে করতেই হবে।

 

একদিন বাবা আমার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এবার থেকে বাইরে বেরোবার সময় এটা পরে বেরোবে”।

কি এটা?

হিজাব। হিজাব চেন না? যথেষ্ট বয়েস হয়েছে। এবার পর্দার সাথে থাকতে হবে।বুঝলে?

 

এটা পরে স্কুলে যাব কি করে? সবাই হাসবে তো?

 

তাহলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দাও! অনেক হয়েছে। আর দরকার নাই। এবার বাড়িতে বসে হাদিস কোরান শেখ। তেমন হলে আর একজন মৌলভী রেখে দোব।

 

 আমার চোখ ফেটে পানি এল। আমার সেই বাবা! যার কাছে আমি শিখেছি,সকল ধর্মই মানুষের তৈরি। যুগে যুগে কিছু বুদ্ধিমান মানুষ নিজের সুবিধার জন্য কিছু নিয়ম কানুন তৈরি করে, সেগুলিকে ধর্মের মোড়কে মুড়ে, সমাজ তথা আর সব মানুষদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। মানবতাই হল আসল ধর্ম। আর আজ সেই মানুষটা ধর্ম নিয়ে এতটাই বাড়াবাড়ি করছে যাতে করে আমার বর্তমান, ভবিষ্যত সমস্ত এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

 

আমিও জেদি। বাবার জেদি মেয়ে। হিজাব পরে স্কুলে যেতে শুরু করলাম। প্রথমদিন অনেকে কৌতূহল করল। বললাম,মাথায় এলার্জি হয়েছে। ডাক্তার রোদ লাগাতে বারণ করেছে, তাই এই ব্যবস্থা। বিশ্বাস করল কি করল না জানি না। তবে এর পর এটা নিয়ে  কেউ আর বিশেষ কিছু বলল না।

মাধ্যমিক পরীক্ষার বেশি দেরি নাই। বাবা একদিন মাকে বলল, “বীথিকে আজ দেখতে আসবে”।

দেখতে আসবে? মানে? মা বিস্মিত হয়ে শুধোল।

 দেখতে আসার মানে বুঝিয়ে বলতে হবে? এক জায়গা থেকে ওর বিয়ের একটা সমন্ধ এসেছে। তারা একবার দেখে যাবে।

 সামনে মেয়েটার মাধ্যমিক পরীক্ষা। তোমার ব্যাপার স্যাপার বুঝতে পারছি না।

 আরে বাবা! দেখলেই তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না? সমন্ধটি ভাল। একবার দেখে গেলে ক্ষতি কি? সব যদি ঠিক থাকে তাহলে পরীক্ষার পরেই না হয় বিয়ে হবে।

 

বীথি কি রাজি হবে? ওর তো পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছা। তুমিই তো ওর মধ্যে সেই ইচ্ছেটা তৈরি করে দিয়েছ। তার কি হবে?

 

 আগে পছন্দ হোক। পরেরটা পরে ভাবা যাবে।

 

মা সঙ্কোচে এতটুকু হয়ে আমার কাছে সব খুলে বলল। সব শুনে আমি বললাম, “এখন অন্য কিছু নিয়ে ভাববার সময় নাই মা! যারা আসছে আসুক। পরে দেখা যাবে”।

মা ভেবেছিল দেখতে আসার কথা শুনে আমি চেঁচামেচি করব। নয়তো কন্নায় ভেঙ্গে পড়ব। তার কোনটাই হলনা দেখে মা খুব অবাক হল।

 

নির্দিষ্ট দিনে পুরুষ,মহিলা মিলে কয়েকজন আমাকে দেখতে এল। শাড়ি গয়নায় সেজে তাদের সামনে  আমাকে বসতে হল। মামুলি কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হল। কোরান শরিফ পড়ে শোনাতে হল। ও হ্যাঁ, ছেলেটিও সঙ্গে এসেছে। সে ব্যাঙ্কে কাজ করে। মেয়েদের পড়া শোনার ব্যাপারে তার অভিমত, মুসলমান মেয়েদের শিক্ষিত হওয়া দরকার। তবে সেটা অবশ্যই হতে হবে পর্দার সাথে। বেপর্দাভাবে কখনোই নয়। কথাবার্ত্তায় জানা গেল  আমাকে তাদের পছন্দ হয়েছে। বিয়েতে তারা দেরি করতে চায়না। পরীক্ষার পর বিয়ে। বিয়ের দিনও স্থির হয়ে গেল।

 

ঘণ্টা তিনেক পর বাড়িটা আবার আগের জায়গায় ফিরে এল। আমি সমস্ত ঝেড়ে ফেলে বই নিয়ে বসলাম। কিন্তু পড়ায় মন দিতে পারছি কই? বুকের ভিতর একটা কষ্ট ড্যালা পাকাতে শুরু করেছে। বাবার ওপর প্রচণ্ড অভিমান হচ্ছে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছি না। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। এই মন নিয়ে কিভাবে পরীক্ষা দোব? কি হবে পরীক্ষা দিয়ে? কয়েকজন মিলে আমার জীবনের গতিপথ ঠিক করে দেবে? এটা কোনমতেই হতে পারে না। এর থেকে পরিত্রাণের পথই বা কি? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তোমার কথা আমার মাথায় এল। 

 

 মায়ের মুখে অনেকবার তোমার কথা শুনেছি। তুমি মায়ের খুব ভাল বন্ধু ছিলে।ক্লাস নাইনে পড়তে পড়তে মায়ের বিয়ে হয়ে যায়। তুমি পড়াশোনা চালিয়ে যাও। তারপর স্কুলের চাকরি নিয়ে মালদা টাউনে চলে যাও। সেখানে একাই থাক। মাঝে মধ্যে ফোনে মায়ের সাথে তোমার কথা হত। আমি ছোটবেলা থেকেই তোমাকে রোল মডেল হিসেবে ভেবেছি। স্বপ্ন দেখতাম, আমিও বড় হয়ে তোমার মত স্কুলে পড়াব। কিন্তু সব কেমন ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে। মায়ের ফোন থেকে তোমাকে ফোন করলাম। তুমি পড়াশোনার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবে বলে আশ্বাস দিলে। মাথা ঠান্ডা রেখে পরীক্ষাটা দিতে বললে। এই মুহূর্তে মাকে কিছু জানাতে নিষেধ করলে। হয়তো কোন অসতর্ক মুহূর্তে মায়ের মুখ থেকে কিছু বেরিয়ে যেতে পারে। তাহলে শেষ রক্ষা হবে না। তোমার একটা কথা সেদিন আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল। তুমি বলেছিলে, “নিজেই নিজের হাত ধর। ভেঙ্গে পড়োনা। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে”।

 

মা কিছু একটা সন্দেহ করছিল। আমি এত সহজে সব কিছু মেনে নিচ্ছি এইখানটায় কিছুতেই মেলাতে পারছিল না। যত দিন যেতে লাগল,মা যেন ভয়ে কাঁটা হয়ে যেতে লাগল। পরীক্ষা ভালই হল। তোমার আশ্বাস না পেলে হয়তো পরীক্ষা দিতেই পারতাম না।

 

 এদিকে আমার বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। মা বিরস মুখে সব কিছু  করছে। কাল ভোরে আমি রওনা দোব। তুমি রাতের ট্রেনে নেমে স্টেশনে অপেক্ষা করবে। আমাকে সঙ্গে নিয়ে আবার ফিরে যাবে। তোমার সঙ্গে আমার তেমনই কথা হয়েছে। আমি একা যেতে চেয়েছিলাম। তুমি রাজি হওনি। রাতে মাকে সব খুলে বললাম। মা একটুও অবাক হল না। মা এমনই একটা কিছু সন্দেহ করেছিল।সারা রাত আমি আর মা জেগে কাটালাম। ফজরের আজান হতেই বাবা মসজিদে চলে গেলে আমি বেরিয়ে পড়লাম। কিছুদুর এগিয়ে দেবে বলে মা আমার পিছু নিল।

ধীরেধীরে আকাশ ফর্সা হচ্ছে। ঝিরঝির করে বাতাস দিচ্ছে। শরীর মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। মা,আমি কারও মুখে কোন কথা নাই। হঠাৎ দমকা বাতাসে আমার মাথা থেকে হিজাবটি উড়ে গিয়ে  রাস্তার ধারে কাঁটা ঝোপের মধ্যে গিয়ে পড়ল।তাড়াহুড়ো করে সেটিকে ঠিক করে বাঁধা হয়নি। আমাকে সরিয়ে দিয়ে মা সেটিকে  উদ্ধার করে তার একটা কোনা মুঠোয় ধরে বাতাসে মেলে দিল। সাদা কাপড়ের টুকরোটি বাতাসে দোল খেতে লাগল। পতাকার মত।

 মা! দাও! ট্রেনের দেরি হয়ে যাবে। আমি হাত বাড়ালাম।

 মা এবার তার মুঠোটি খুলে দিল। সাদা কাপড়ের টুকরোটি মাঠের ওপর দিয়ে পত পত করে উড়ে যেতে লাগল। ঠিক যেন একটা সাদা কপোত আকাশের গায়ে ডানা মেলে দিয়েছে। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম সেদিকে।

 

 ট্রেন ছুটে চলেছে। কথা শেষ করে বিথী আবার জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে। ওকি মুক্ত ডানার কপোতটিকে খুঁজছে? আমি আবার চোখ বন্ধ করলাম।

লেখক : ছোটগল্পকার

ছবি : সংগৃহীত

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment